×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ০৭:৪৮:৪০
৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে এবং আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গত সপ্তাহ থেকেই গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মন্দিরে আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সভাপতিত্ব করেন। এ সময় দলের স্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য সাগরে দুটি জাহাজ রয়েছে, যার মালিকানা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি বলেও জানান তিনি। একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্য জাহাজটির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে এবং এর প্রভাবে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। সরকার দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে গ্যাস আনার চেষ্টা করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন তারা।

গ্যাস ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার দাবি, একটি শ্রেণি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়া ব্যক্তিরা লাভবান হলেও একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ গ্যাস সংকটে পড়ছেন। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। কেউ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা তেল ব্যবহার বা সংগ্রহ করলে তা প্রতিরোধে সামাজিকভাবে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।

চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকট ও সরবরাহের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়েছে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানির দাম নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও শুরুতে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দেশে তেলের ব্যবহার ও চাহিদার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে সরকারকে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

দেশীয় গ্যাস উত্তোলন না করে কেন বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মাটির নিচে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, তার প্রকৃত অবস্থা এখনো পুরোপুরি জানা নেই। তার অভিযোগ, বিগত ১৭ বছরে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্সকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে বিদেশিনির্ভর হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাপেক্সকে সক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে নতুন গ্যাসের সন্ধান পেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৩০টি গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে গ্যাস অনুসন্ধান একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের পর এই দায়িত্ব গ্রহণ সহজ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, বিগত সময়ে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। এসব সম্পদ দেশের মানুষের এবং বর্তমান সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য দুটি—একদিকে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যদিকে তৃণমূল ও সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। নারীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও এ সময় তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৪১ লাখ নারীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য করতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তারেক রহমান। দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ এবং কৃষকদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিঋণ মওকুফের বিষয়টিও তুলে ধরেন। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ তাদের নির্বাচিত করেছে বলেই সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যথাসম্ভব পূরণ করা।

সব মিলিয়ে, বর্তমানে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার যে আশাবাদ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়—এখন সেদিকেই নজর রাখছেন সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে