×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজের ইচ্ছায় নয়, কুকুরের নির্দেশেই করতেন খুন!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ০৭:৪০:৫৮
নিজের ইচ্ছায় নয়, কুকুরের নির্দেশেই করতেন খুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৯৭০-এর দশকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড পুরো শহরকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। অজ্ঞাত এক বন্দুকধারী হঠাৎ করে গাড়িতে বসে থাকা তরুণ-তরুণীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাত, এরপর দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেত। হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা থাকত না, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে তার কোনো পরিচিত শত্রুতার তথ্যও পাওয়া যেত না। কয়েক সেকেন্ডের গুলির শব্দের পর রাস্তায় পড়ে থাকত রক্তাক্ত মানুষ। ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক হামলা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নেয়। নিউইয়র্কবাসী বুঝতে পারে, তারা একজন সিরিয়াল কিলারের মুখোমুখি হয়েছে।

১৯৭৬ সালের ২৯ জুলাই থেকে ১৯৭৭ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আটটি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় ছয়জন নিহত এবং সাতজন আহত হন। বেশিরভাগ হামলায় একটি .৪৪ ক্যালিবার হ্যান্ডগান ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার ধরনেও ছিল একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য—অনেক ক্ষেত্রেই রাতে গাড়ির ভেতরে থাকা তরুণ-তরুণীদের লক্ষ্য করা হতো। ফলে রাতের নিউইয়র্কে গাড়িতে বসে থাকা কিংবা নির্জন সড়কে চলাচল করাও মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমও রহস্যময় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ব্যক্তিকে খুঁজতে তৎপর হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে খুনি পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করে। চিঠিগুলোর ভাষা ছিল ব্যঙ্গাত্মক, রহস্যময় এবং উসকানিমূলক। সেখানেই সে নিজের পরিচয় দেয় ‘সন অব স্যাম’ নামে। চিঠিগুলোর মাধ্যমে সে শুধু নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়নি, বরং তদন্তকারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। নামটি দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অজ্ঞাত বন্দুকধারী ‘সন অব স্যাম’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ তদন্তের পর অবশেষে ১৯৭৭ সালের ১০ আগস্ট গ্রেপ্তার হন ডেভিড বারকোভিটজ। তার কাছ থেকে একটি .৪৪ ক্যালিবারের পিস্তল উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র ছিল শেষ দিকের একটি হামলার এলাকার কাছাকাছি তার গাড়িতে পাওয়া পার্কিং টিকিট। ওই টিকিটের সূত্র ধরে গাড়িটির মালিকের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। তদন্ত এগোতে থাকলে পুলিশের সন্দেহ বারকোভিটজের দিকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে গ্রেপ্তারের পর ঘটনাটি আরও অদ্ভুত মোড় নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বারকোভিটজ দাবি করেন, তার প্রতিবেশী স্যাম কারের একটি কালো ল্যাব্রাডর রিট্রিভার ছিল, যার নাম হার্ভে। বারকোভিটজের দাবি ছিল, ওই কুকুরটির মধ্যে কোনো অশুভ শক্তি বা ডেমন বাসা বেঁধেছিল এবং সেই অশুভ শক্তিই তাকে মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিত। অর্থাৎ তার বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সিদ্ধান্ত যেন তার নিজের ছিল না; একটি কুকুরের মাধ্যমে কথিত অতিপ্রাকৃত শক্তি তাকে এসব অপরাধে প্ররোচিত করত।

বারকোভিটজের এই অদ্ভুত দাবি দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ‘ডেমন ডগ’ বা অশুভ শক্তির অধিকারী কুকুরের গল্পটি মামলার অন্যতম আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বারকোভিটজ নিজেই এই গল্প থেকে সরে আসেন। ফলে কেন তিনি এমন একটি গল্প তৈরি করেছিলেন, তার নিশ্চিত উত্তর আজও নেই। তার বক্তব্যের পেছনে প্রচারের আকাঙ্ক্ষা, মানসিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ কাজ করেছিল কি না—এ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এসবের কোনো একটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

শেষ পর্যন্ত বারকোভিটজ ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষ স্বীকার করেন। আদালত তাকে প্রতিটি হত্যার জন্য ২৫ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে কারাগারে যাওয়ার পরও নিজের অপরাধ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কয়েকজন ব্যক্তি এবং একটি শয়তানপূজারি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে তদন্তে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী জীবনে বারকোভিটজ ধর্মীয় জীবনের দিকে ঝুঁকেছেন এবং নিজের অপরাধের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন। তবে তার পরবর্তী অনুশোচনা অতীতের সেই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা কিংবা নিহতদের পরিবারের ক্ষতি ফিরিয়ে দিতে পারেনি। ‘সন অব স্যাম’ নামে পরিচিত এই সিরিয়াল কিলারের ঘটনা আজও অপরাধ ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আছে—বিশেষ করে তার অপরাধের সঙ্গে কথিত ‘ডেমন কুকুর’-এর সম্পর্কের অদ্ভুত দাবি এবং পরে সেই দাবি থেকে সরে আসার কারণে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে