×
ঢাকা, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জামায়াতের লং মার্চ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য মাহফুজ আনামের

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১১ ২৩:০৭:৫৯
জামায়াতের লং মার্চ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য মাহফুজ আনামের

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলনের সিদ্ধান্তকে ‘ম্যাচিউর’ বা পরিপক্ক রাজনীতির লক্ষণ বলে মনে করেন না দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তার মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে এই মুহূর্তে রাস্তায় নেমে যাওয়াটা কিছুটা ‘ইমমেচিওর’ বা অপরিণত সিদ্ধান্ত।

মাহফুজ আনাম মনে করেন, বিরোধী দলগুলো বর্তমানে সরকারের নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশের সব রাজনৈতিক দলকে এই মুহূর্তে রাষ্ট্র যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা অনুধাবন করতে হবে। পত্রিকাটির নিয়মিত পডকাস্ট ‘সম্পাদক কহেন’-এ তিনি এসব কথা বলেন।

ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য একটি স্থিতিশীল সরকার সবচেয়ে বেশি জরুরি। জামায়াতের যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে তা পার্লামেন্টে বা সংসদে উত্থাপন করা উচিত।

সংসদে বারবার অভিযোগ করে জনগণের কাছে বার্তা দেওয়া যেতে পারে যে, তারা বিষয়গুলো উত্থাপন করছে কিন্তু সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না। মাহফুজ আনাম পরামর্শ দেন, বর্তমান সংকট কিছুটা কেটে যাওয়ার পর রাস্তায় নামা যেতে পারে। এখনই কেন রাস্তায় নামতে হবে? তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, দুর্বল মুহূর্তে সুযোগ নিয়ে সরকারকে আরও কোণঠাসা করাকে তিনি পরিপক্ক রাজনীতি বা দেশের মঙ্গলকামী রাজনীতি মনে করেন না।

দেশের অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, প্রতিদিন গ্যাস ও এলএমজি কেনার জন্য ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠছে।যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমাবর্ষণ করছে, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালাচ্ছে এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিপিং লেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমন বিশ্বপরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাস্তায় নেমে যাওয়াকে তিনি ‘ইমমেচিওর’ মনে করেন। বিরোধীরা সরকারের বেকায়দা পজিশনের অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে বলেই তার ধারণা।

তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর জনসাধারণের মধ্যেও এক ধরণের উচ্ছৃঙ্খলতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, কিছু হলেই রাস্তায় নামতে হবে। যেমন জামায়াতের আমির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দাবি না মানলে ‘এক দফা’ আন্দোলন হবে। এক দফা মানে তো সরকারকে পতন বা বহিষ্কার করা। বাংলাদেশের প্রশাসন ও ভাবমূর্তির জন্য এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকার জুলাই সনদ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে বলে মাহফুজ আনাম মনে করেন না, তবে তাদের উদ্যোগে সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মন্তব্য করেন। সংবিধান ‘সংশোধন’ কমিটি গঠন নিয়ে জামায়াতের আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত চায় ‘সংস্কার’ পরিষদ। ‘সংশোধন’ ও ‘সংস্কার’—এই দুই শব্দের মধ্যে এমন কী পার্থক্য যে তার জন্য তারা চলে যাবে?

মাহফুজ আনাম সরকারের ভূমিকারও সমালোচনা করে বলেন, বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের দাবিদাওয়ার কোনো কোনো জায়গায় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সরকারের আরও উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টান্ত খুব আশাব্যঞ্জক নয়। হিউম্যান রাইটস কমিশন বা গুম কমিশনের মতো ফান্ডামেন্টাল অর্ডিনেন্স বা মৌলিক অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে সরকারকে আরেকটু ছাড় দেওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।

নির্বাচনের মাত্র পাঁচ-ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মাহফুজ আনাম বলেন, পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকার ফেলে দেওয়ার প্রশ্নটি গণতন্ত্রসম্মত হতে পারে না। এটি অপরিণত রাজনীতি। পাঁচ-ছয় মাসের মাথায় ‘এক দফা’ ডাকলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না, আর স্থিতিশীলতা ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের সমাধান জামায়াতের কাছে আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমার জানা মতে নেই। একেবারেই নাই।’

তিনি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, জামায়াত বলছে সরকারকে উৎখাত করবে, আর সরকার একে ষড়যন্ত্র বলছে। অবিশ্বাস ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির সেই পুরোনো ডায়ালগেই সব ফিরে যাচ্ছে। তবে যেহেতু সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি, তাই সরকারকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদের সঙ্গে আপস বা কম্প্রোমাইজ করতে সরকারের বাধা থাকা উচিত নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে মোটামুটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত ও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন। তবে বিএনপি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি মানসিকতা কাজ করছে যে, দীর্ঘদিন সাফার করার পর এখন ‘রিওয়ার্ড’ বা পুরস্কার পাওয়ার সময় এসেছে। দল ক্ষমতায় যাওয়ায় সরকার থেকে ব্যবসা, চাকরি বা ভর্তুকি পাওয়ার এই মানসিকতা রাজনৈতিক দলের জন্য আত্মঘাতী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক মাসে উনার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ জনগণকে আশান্বিত করছে এবং কনফিডেন্স বাড়াচ্ছে। তবে দলের সবাই যদি রিওয়ার্ড পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকে, তবে দলনেতার অপশন বা সুযোগ অনেক কমে যায়। তারেক রহমান সাহেবের সামনেও অপশনগুলো কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে