×
ঢাকা, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের এক বাড়িতে ৬৩ বিদেশি নাগরিক, বেরিয়ে আসছে রহস্য

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১১ ২২:৫২:৩১
চট্টগ্রামের এক বাড়িতে ৬৩ বিদেশি নাগরিক, বেরিয়ে আসছে রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের খুলশীর একটি আবাসিক বাড়িতে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক। চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের এসব নাগরিকের কারও হাতে ছিল মোবাইল ফোন, আবার কেউ ব্যস্ত ছিলেন ল্যাপটপে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক আবাসিক বাড়ি মনে হলেও পুলিশের অভিযানের পর সেখানে সংঘবদ্ধ অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য সামনে এসেছে।

বাড়িটি এক দুবাইপ্রবাসীর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের অভিযানে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপ। এর পাশাপাশি একটি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, স্যামসাং মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রিন্টার, পাঁচটি পেনড্রাইভ ও চারটি সিমকার্ড পাওয়া যায়। উদ্ধার করা হয়েছে পাকিস্তানের তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং কম্বোডিয়ার একটি কর্মসংস্থান কার্ডও।

এই ঘটনায় সামনে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক কীভাবে একসঙ্গে চট্টগ্রামে এসে একটি আবাসিক বাড়ি ভাড়া নিলেন এবং সেখানে প্রায় দেড় মাস অবস্থান করলেন, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বাড়ির মালিক, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা অবগত ছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে কোন দেশের নাগরিকের সংখ্যা বেশি, বাড়িটি কারা ভাড়া নিয়েছিলেন এবং ভাড়াটেদের পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল— এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির মালিক একজন দুবাইপ্রবাসী। প্রায় দেড় মাস আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে সেখানে বিদেশি নাগরিকরা অবস্থান শুরু করেন।

উদ্ধার হওয়া বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বাড়িটিতে অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি সংগঠিত ব্যবস্থা থাকার ধারণা করছে পুলিশ। অভিযানে ৬৩ জনের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রত্যেকের কাছে গড়ে প্রায় দুটি করে মোবাইল ফোন ছিল। এর সঙ্গে উদ্ধার হয়েছে ৫৭টি ল্যাপটপ।

পুলিশের অভিযানে একটি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, স্যামসাং মনিটর, কিবোর্ড, মাউস ও প্রিন্টারও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পাঁচটি পেনড্রাইভ এবং চারটি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র ও কম্বোডিয়ার একটি কর্মসংস্থান কার্ডও জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশের কাছে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এতগুলো ডিভাইস কী উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করে অনলাইন যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন, ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুধু বিদেশিরা নন, আছে সহযোগীরাও

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির মধ্যেই ওই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে দেশি ও বিদেশি সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সহযোগীর কয়েকজন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন বলেও গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুলিশকে জানিয়েছেন।

এই সহযোগীদের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাড়ি ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে যাতায়াত, যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা অর্থ লেনদেনে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। কারণ, এতজন বিদেশি নাগরিকের জন্য বাসস্থান, বিপুলসংখ্যক প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা এককভাবে পরিচালনা করা কঠিন।

চট্টগ্রাম কেন?

অনলাইন অপরাধের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান অনেক সময় বড় বিষয় না হলেও চট্টগ্রাম একটি বন্দরনগরী হওয়ায় এখানে দেশি-বিদেশি মানুষের চলাচল তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়মিত যাতায়াতও রয়েছে। এই সুযোগ কোনো অপরাধী চক্র কাজে লাগিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া বিদেশি নাগরিকরা ঠিক কী উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে এসেছিলেন, কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এবং তাদের ভিসার ধরন কী— এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

তদন্তে সামনে আসবে বড় নেটওয়ার্ক?

একটি আবাসিক বাড়ি থেকে একসঙ্গে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার এবং বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনা বিষয়টিকে সাধারণভাবে বিদেশিদের আবাসিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ রাখছে না। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে দেশি-বিদেশি সহযোগীদের সম্পৃক্ততা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের অবস্থানের তথ্যও উঠে এসেছে।

তদন্তে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে ৬৩ জনের প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টি। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কারা যুক্ত ছিলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল এবং এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

উদ্ধার করা মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণ থেকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি বাড়ির ভাড়ার চুক্তিপত্র, বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশসংক্রান্ত নথি এবং তাদের আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা হলে এই চক্রের বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, এ ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা হচ্ছে। তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের ওই বাড়ি থেকে পরিচালিত অনলাইন কর্মকাণ্ডের ধরন এবং এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে