×
ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রুমিন ফারহানার বক্তব্য সরকারি-বিরোধী দলে উত্তেজনা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ২১:২৪:৩৪
রুমিন ফারহানার বক্তব্য সরকারি-বিরোধী দলে উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বুধবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিলের ওপর আলোচনায় বিএনপির সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার সময় সরকারি দলের সদস্যরা হইচই করে প্রতিবাদ জানান। পরে হট্টগোলের মধ্যেই বিলটি সংসদে পাস হয়।

বিলের আলোচনায় বর্তমান সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বিএনপির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ শাসন নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক সরকারেরই একটি নির্দিষ্ট চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না—এমনটা হতে পারে না। একইভাবে সারের সংকট হবে না, দরিদ্র কৃষক সার কারখানায় গিয়ে তা লুট করবেন না—এটিও সম্ভব নয়।

রুমিন আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না—এমনটিও হওয়ার নয়। তার বক্তব্যের এ পর্যায়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন। তবে সেই পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি বক্তব্য চালিয়ে যান।

তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ অবস্থান অর্জন করবে না—এটিও হতে পারে না। তার ভাষ্য, বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই ঋণখেলাপিতে শীর্ষে যাওয়া এবং ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপি হওয়া।

সংসদ সদস্যদের হট্টগোলের মধ্যে রুমিন ফারহানা বলেন, সংসদ এতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে যে তাঁর মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার সময় তারাও হট্টগোল করতেন; এখন বিএনপিও একই আচরণ করছে, বরং আরও খারাপ আচরণ করছে।

বিলের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন বলেন, সংসদের অধিকাংশ সদস্যই ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটাতে হাইকোর্টে রিট করা—এগুলো পুরোনো সংস্কৃতি এবং এমন ঘটনা অনেক দেখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একপর্যায়ে রুমিনের জন্য বরাদ্দ সময় শেষ হয়ে গেলে তাঁর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সংসদে হইচই চলতে থাকায় তিনি মাইক ছাড়াই বক্তব্য দিতে থাকেন। এ সময় সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য তাঁর উদ্দেশে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

এর প্রতিবাদে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। রুমিন দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগ করেন, তাঁকে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছে। স্পিকার বারবার তাঁকে বসার অনুরোধ জানালেও তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন।

এ সময় এনসিপির সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গালি দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের অন্য সদস্যদেরও প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান। পরে একপর্যায়ে হান্নান মাসউদ সংসদ থেকে বেরিয়ে যান।

সরকারি দলের সদস্যদের হট্টগোলের জবাবে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যও রুমিনের পক্ষে মাইক ছাড়া কথা বলতে থাকেন। সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এ সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন এবং ডেপুটি স্পিকার সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদে সবাই কথা বলছেন এবং সংসদের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করতে চান তারা। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জায়গায় সংসদে নিজেরাই যদি সমস্যা তৈরি করেন, তাহলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। তিনি সংসদে স্বাস্থ্যকর আলোচনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, একজন সদস্য যখন বক্তব্য দেন, তখন তাঁর নিজেরও বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মাত্র কয়েকদিন আগেই রুমিন ফারহানা বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন।

জবাবে ডেপুটি স্পিকার চিফ হুইপের দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য কথা বলার অধিকার রাখেন। বক্তব্যে অসংসদীয় কিছু থাকলে সভাপতির আসন থেকে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে। তবে বক্তব্যে বাধা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। চিফ হুইপ হিসেবে সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখাও তাঁর দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন ডেপুটি স্পিকার।

এদিকে বিলের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তিনি বিষয়টি কী তা বুঝতেই পারছেন না। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তুর মিল নেই এবং পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সবকিছু হয়তো সংগত নয়, আবার গুরুত্বপূর্ণ কথাও থাকতে পারে। কিন্তু হট্টগোলের কারণে তাঁর বক্তব্যের কিছুই শোনা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরে সংসদ থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন রুমিন ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগালি করেছেন। একই সঙ্গে চিফ হুইপের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস

এদিকে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আলোচিত ও সমালোচিত ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করে অর্থমন্ত্রীর উত্থাপিত ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল সংসদে পাস হয়েছে। বিলের ওপর জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে এটি পাস করা হয়।

সংশোধিত বিলে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের কথা বলা হয়েছে। ওই ধারায় কোনো ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা শেয়ারধারক ছিলেন, তারা চাইলে পরবর্তীতে ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারতেন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও একই সুযোগ দিতে পারত।

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করার সময় ওই ধারাটি রাখেনি। পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটি সংশোধন করে অনুমোদন করা হয় এবং তখন ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল।

ধারাটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেওয়ার পর সরকার সেটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সংশোধনী এনে বুধবার সংসদে বিলটি পাস করা হয়।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ধারার পূর্ণ শর্ত পূরণ করে ইতোমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ১৮(ক) ধারা বিলুপ্ত করাই সমীচীন।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে