×
ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভাইভার নম্বর বাড়ছে ৪০০%! নাহিদের ৬ দফা দাবিতে নতুন বিতর্ক

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১২:০২:৫৩
ভাইভার নম্বর বাড়ছে ৪০০%! নাহিদের ৬ দফা দাবিতে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার, লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর সিদ্ধান্ত বাতিলসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নাহিদ ইসলাম এসব দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পরিবর্তন গেজেট আকারে প্রকাশের আগেই সরকার চাইলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

নাহিদ ইসলামের দাবি, সরকারি চাকরির ভাইভার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থীর উত্তর ও প্রাপ্ত নম্বরের একটি দালিলিক রেকর্ড থাকে। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় একজন প্রার্থী কেন বেশি বা কম নম্বর পেলেন, সেটি পরবর্তী সময়ে যাচাই করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, একই ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য একটি ভাইভা বোর্ড যদি কোনো প্রার্থীকে ৪৫ নম্বর দেয় এবং অন্য একটি বোর্ড ২৫ নম্বর দেয়, তাহলে এই ২০ নম্বরের পার্থক্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। তাঁর মতে, ভাইভার নম্বর ৪০ বা ৫০ হলে বোর্ডের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন একজন প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য নতুন মানবণ্টনের প্রস্তাবে তিনটি স্তর রাখা হয়েছে—১১-১২তম, ১৩-১৬তম এবং ১৭-২০তম গ্রেড। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

১১ ও ১২তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা ১০০ নম্বরের করার এবং লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৬০ করার এবং পাস নম্বর ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ করার প্রস্তাব রয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে নিয়োগের চূড়ান্ত ফলে মৌখিক পরীক্ষার প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা করছেন নাহিদ ইসলাম।

ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোর পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যে যুক্তির কথা গণমাধ্যমে এসেছে, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে কেউ পরীক্ষায় সুবিধা নিলে তার সমাধান হওয়া উচিত পরীক্ষাকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করার মাধ্যমে।

তিনি বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ইলেকট্রনিক ডিভাইস শনাক্তকরণ, প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

নাহিদের মতে, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তার দায় চাকরিপ্রার্থীদের ওপর চাপিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ানো সমাধান হতে পারে না।

১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি পদে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী আবেদন করেন। নাহিদ ইসলাম মনে করেন, এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক তরুণ সরকারি চাকরির প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও অনেকে পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ফলে একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষা শুধু একজন প্রার্থীর ক্যারিয়ার নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভা বোর্ডের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের প্রভাব অতিরিক্ত বাড়ানো হলে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের খবরও এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।

শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে। বিশেষ করে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর ফলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীর ফলাফল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিয়োগব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে নাহিদ ইসলাম ছয়টি দাবি তুলে ধরেছেন। সেগুলো হলো—

১. ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে এবং গেজেট প্রকাশের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

২. লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর প্রস্তাব বাতিল করতে হবে।

৩. ভাইভার নম্বর যুক্তিসংগত সীমায় রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে শিক্ষক, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, চাকরিপ্রার্থী ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত নিতে হবে।

৪. প্রক্সি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি ঠেকাতে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে।

৫. ভাইভা বোর্ডে নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ছক চালু করতে হবে। কোন প্রার্থী কোন মানদণ্ডে কত নম্বর পেয়েছেন, তার লিখিত রেকর্ড রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে ভাইভা ভিডিও রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনতে হবে।

৬. ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় আরও কেন্দ্রীভূত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিয়োগে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড বা অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ কমে।

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে জুলাইয়ের আন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ওই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।

তাঁর বক্তব্য, সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন কোনো পরিবর্তন আনা উচিত নয়, যাতে একজন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে কয়েকজন ব্যক্তির মৌখিক মূল্যায়নের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, নতুন কোনো ব্যবস্থা যেন আবার বৈষম্য বা নিয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহের পরিবেশ তৈরি না করে।

এদিকে, প্রস্তাবিত নতুন মানবণ্টন এখনো চূড়ান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নাহিদ ইসলামের দাবির পর বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে