ঢাকা, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে, স্বস্তি শ্রমিক-এজেন্টদের

২০২৬ আগস্ট ২৩ ১৯:২৬:৫৭
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে, স্বস্তি শ্রমিক-এজেন্টদের

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ঘোষণায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দেশটিতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টরা। শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার উদ্যোগের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসাও করেছেন তারা।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পাশাপাশি এবার কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতা ও নিয়োগানুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সির মধ্য থেকে পছন্দ অনুযায়ী এজেন্সি নির্বাচন করতে পারবে। মাত্র ৬ হাজার টাকা ফি দিয়ে যেকোনো এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে।

সরকারের অনুমোদন নিয়ে বর্তমানে ৩১২টি এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে অন্য এজেন্সিগুলোকেও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এছাড়া ২৫টি অনুমোদিত এজেন্সির যেকোনো একটির অনুমোদন সাপেক্ষে যে লাইসেন্সে কাজ আসবে, সেই লাইসেন্সের অধীনে বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং সক্ষম সব এজেন্সির অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের ভাষ্য, দেশটিতে তুলনামূলক বেশি মজুরি এবং ভালো কর্মপরিবেশ রয়েছে। নতুন করে শ্রমবাজার চালু হলে তারা সহজে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন। এতে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তারা আশা করছেন। কলিং ভিসা পুনরায় চালুর খবরে সম্ভাব্য শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা ও বিদেশ যেতে আগ্রহী মহিউদ্দিন রিংকু বলেন, তার খালাতো ভাই ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন। বর্তমানে তিনি সেখানে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি করছেন। রিংকু বলেন, তিনিও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন এবং মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা কবে চালু হবে, সেই অপেক্ষায় ছিলেন। এখন ভিসা চালুর ঘোষণা আসায় তিনি আশা করছেন, এবার কম খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন।

পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা পারভেস আলমও একই আশার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে চেষ্টা করেও মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। এরপর থেকে কলিং ভিসা চালুর অপেক্ষায় ছিলেন। এখন শ্রমবাজার পুনরায় চালুর খবরে তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছেন। তবে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এর পরদিন ১ জুন থেকে নতুন করে বিদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগও বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) প্রকাশিত ওই তালিকা বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। তবে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি মালয়েশিয়া সরকার।

এদিকে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যখনই পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই একটি চক্র বাজারটি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। তারা শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর নয়াপল্টনের ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিন বলেন, সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি মালয়েশিয়া। বিশ্বের অনেক দেশে ভাষাজ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় না। তবে মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দেশটি দক্ষ ও অদক্ষ—দুই ধরনের কর্মীই নেয়। এমনকি সেখানে কাজের জন্য ভাষাজ্ঞানও বাধ্যতামূলক নয়।

নাজিম উদ্দিন বলেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। এর পাশাপাশি ওভারটাইমের সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বেশ মিল রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দেশটি ভালো একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। তার মতে, দুই বছরের বেশি সময় বাজার বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের উদ্যোগে বাজারটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এবার প্রায় সব এজেন্সি মালিকের ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে শ্রমবাজারটি আগের তুলনায় আরও উন্মুক্ত ও বিস্তৃত হয়েছে। স্বল্প খরচে নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।

কাকরাইলের ব্যবসায়ী শফি উদ্দিন বলেন, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার খবর অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। তার আশা, এবার বাংলাদেশি শ্রমিকরা কম খরচে এবং নিরাপদভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

শফি উদ্দিন বলেন, নিজে কাজ সংগ্রহ করে নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে বিএমইটি ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে। তার অভিযোগ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেই একটি চক্র এর বিরোধিতা করে। তার দাবি, ওই চক্রটি কাউন্টার সেটিংসহ বিভিন্ন অবৈধ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। বৈধ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হলে তাদের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে বলেই তারা বাজার চালুর বিরোধিতা করছে। সরকারের উচিত এ ধরনের অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গত শুক্রবার এফডব্লিউসিএমএস প্রকাশিত তালিকায় থাকা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি হলো—বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস, অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড, আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মেসার্স আল-শোতুপ ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড, রিফা ইন্টারন্যাশনাল, ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল-হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড, জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক, নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন। একই সঙ্গে এফডব্লিউসিএমএস ৪০টি মেডিকেল সেন্টারের তালিকাও প্রকাশ করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। তবে ওই সময়ে বাজারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যান তারেক রহমান। তার সফরকে ঘিরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়। সফরের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফরে গেলে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।

দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বায়রার সদস্যভুক্ত সব এজেন্সি যাতে কাজের সুযোগ পায়, সরকার সে বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার আশা, সব এজেন্সিই কাজ করার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে স্বল্প ব্যয়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। শ্রমিকরা যাতে কম খরচে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে