ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

মুনাফায় রেকর্ড, তবুও ব্র্যাক ব্যাংক ছাড়ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

২০২৬ আগস্ট ০৯ ২১:৫৫:৩২
মুনাফায় রেকর্ড, তবুও ব্র্যাক ব্যাংক ছাড়ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারছে না ব্র্যাক ব্যাংক। দেশের অন্যতম লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যাংকটিতে টানা পাঁচ মাস ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের শেয়ার বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির বিদেশি মালিকানা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্র্যাক ব্যাংকে বিদেশি মালিকানা ছিল ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। ওই সময় ব্যাংকটির শেয়ারদরও শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিদেশি অংশীদারিত্ব কমতে থাকে।

মার্চে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৩৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করায় মালিকানা নেমে আসে ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এপ্রিলে আরও প্রায় ৪০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির পর তা কমে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ২২ শতাংশে। মে মাসে ৫০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির ফলে বিদেশি মালিকানা আরও কমে হয় ৩৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

জুনে এসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ আরও তীব্র হয়। ওই মাসে প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির পর ব্যাংকটির বিদেশি মালিকানা নেমে আসে ৩৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে। জুলাইয়ে বিক্রির পরিমাণ আরও বেড়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এর ফলে মাস শেষে বিদেশি মালিকানা নেমে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৯৬ শতাংশে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে ব্যাংকটিতে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এমন আগ্রাসী শেয়ার বিক্রির সঙ্গে ব্যাংকটির আর্থিক পারফরম্যান্সের কোনো মিল নেই। বরং গত কয়েক বছরে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৪০৪ কোটি টাকা। ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৪৬৫ কোটি, ২০২২ সালে ৬১৪ কোটি এবং ২০২৩ সালে ৮২৭ কোটি টাকা।

এরপর ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে রেকর্ড ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় পৌঁছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা তালিকাভুক্ত স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

তাহলে রেকর্ড মুনাফার পরও কেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্র্যাক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন অন্যতম।

এ বিষয়ে এজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ CFA সোসাইটির সাবেক সভাপতি আসিফ খান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রাথমিক ধাক্কাটি এসেছিল বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এতে ব্র্যাক ব্যাংকসহ দেশের বিভিন্ন শেয়ারে বিদেশি মূলধন প্রত্যাহার শুরু হয়।

তার মতে, পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা কমে এলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কিছু নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আবারও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে ঋণের সুদ ও আমানতের সুদের ওজনযুক্ত গড় ব্যবধান বা স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি বিভাগ জানায়, ব্যাংক খাতে গড় স্প্রেড ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে উঠেছে এবং কয়েকটি ব্যাংক ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত স্প্রেডে ঋণ দিচ্ছে। ঋণের ব্যয় কমিয়ে শিল্প কার্যক্রমে গতি আনার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, ২০২৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক একই ধরনের ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমা তুলে নিয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে স্মার্ট বা সিক্স-মাস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিলস পদ্ধতিও বাতিল করা হয়। ফলে পুনরায় নির্দিষ্ট সীমা আরোপকে বাজারভিত্তিক সুদ নির্ধারণ ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।

আসিফ খানের মতে, আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাকে বেশি পছন্দ করেন। নির্দিষ্ট সুদসীমা আরোপকে তারা নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন। কৃত্রিমভাবে সুদের ব্যবধান নির্ধারণ করা হলে ঋণবাজারে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্যাংকটি দেশের এসএমই খাতে অর্থায়নের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বাজারনেতা। বড় করপোরেট ঋণের তুলনায় এসএমই ঋণে ঝুঁকি, পরিচালন ব্যয় ও তদারকি ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে ঋণের সুদ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ৪ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হলে উচ্চঝুঁকির এসএমই ঋণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় নাও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে ঋণখাতের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণকে তাদের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির কারণে ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে এসএমই ঋণ এখনো এই সীমার আওতায় রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এসএমই ঋণকেও এই সীমার বাইরে রাখা প্রয়োজন।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দিষ্ট স্প্রেড সীমা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদ নির্ধারণ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হলে ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ ব্যাংক শেষ পর্যন্ত স্প্রেড সীমা প্রত্যাহার করে বাজারভিত্তিক সুদ নির্ধারণ ব্যবস্থায় ফিরলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হতে পারে। এর ফলে ব্র্যাক ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বিদেশি মূলধন প্রবাহও আবার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে