ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ‘এবার মোদির পালা’

২০২৬ জুলাই ২৭ ১৯:২৪:২৬
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ‘এবার মোদির পালা’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময়ে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা বিরল বলে উল্লেখ করে সাম্প্রতিক এক ছাত্র-যুব আন্দোলনকে দেশটির তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিক্ষোভ ও জনচাপের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনকারীদের অনেকে নিজেদের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।

টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা ছাত্র-যুব আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আটক ও লাঠিচার্জের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে।

দিল্লির ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মী সাখির মতে, প্রতিবাদের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব—এমন একটি নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে তরুণদের মধ্যে। আন্দোলনের সময় তিনি পুলিশের লাঠিচার্জ, আটক ও নির্যাতনের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেন। এসব ভিডিও বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার মূলধারার গণমাধ্যম ও প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বেশি গুরুত্ব দিলেও তরুণ প্রজন্মের কাছে ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মের প্রভাব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। ফলে আন্দোলনের নানা ঘটনা দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।

যেভাবে শুরু হয় আন্দোলন

আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এনইইটি নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়।

আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গধর্মী অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি তোলে।

প্রথমদিকে আন্দোলনটি সীমিত পরিসরে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বড় আকার ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়।

দিল্লি থেকে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন

আন্দোলনের সময় দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে এসব ঘটনার ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনে আরও মানুষ যুক্ত হন।

মুম্বাইয়ের আন্দোলনকর্মী সোমায়া কর্দে বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখলে চলবে না। তার মতে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যের মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।

শিক্ষা থেকে চাকরি—হতাশ তরুণরা

আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা সংকটে রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ এবং উচ্চশিক্ষা শেষে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, উচ্চশিক্ষাকে জীবনে পরিবর্তন আনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখলেও বাস্তবে শিক্ষা শেষ করার পরও অনেক তরুণ স্থায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের নীতির প্রতি তরুণদের আস্থায়ও সংকট তৈরি হয়েছে।

বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ

ভারতে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেও বেকারত্বের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্দোলনকারীরা মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও কর্মসংস্থানের সংকট একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাদের দাবি, শুধু পরীক্ষার আয়োজন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলেই হবে না; শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্যও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ভাইরাল ভিডিওতে বাড়ে ক্ষোভ

আন্দোলনের সময় পুলিশের হাতে আটক এক তরুণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং পরে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়।

ওই তরুণের বক্তব্য, তার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ জনসমক্ষে তুলে ধরা। ভিডিওটি আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

নতুন আত্মবিশ্বাস, সঙ্গে আশঙ্কাও

মন্ত্রীর পদত্যাগের পর আন্দোলনকারীদের একাংশ মনে করছেন, জনমত ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব। তাদের ভাষ্য, এই আন্দোলন তরুণদের মধ্যে ভিন্নমত প্রকাশ ও সরকারের জবাবদিহি দাবি করার নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।

তবে একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ তুলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও ভারতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ব্যবহারের বিষয়ে অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে ভারতের তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। তবে শিক্ষা, বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সামাজিক বৈষম্যের মতো যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত, সেগুলোর সমাধান না হলে এই অসন্তোষ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে