ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন উদ্যোগ, বাস্তবে মিলছে না সুফল

২০২৬ জুলাই ১২ ১১:৫৫:০০
খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন উদ্যোগ, বাস্তবে মিলছে না সুফল

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানো, আটকে থাকা অর্থ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য বাড়াতে সম্প্রতি এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধা চালু করলেও বাস্তবে এর সুফল পাচ্ছেন না অনেক ব্যবসায়ী। নীতিমালা জারির প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক এখনো আবেদন গ্রহণ, সুদ মওকুফ কিংবা এককালীন নিষ্পত্তির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। ফলে নতুন এ সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, নীতিমালার কিছু বিষয় এখনো অস্পষ্ট থাকায় তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু সুদ মওকুফ বা এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও নগদ অর্থের সংকটে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে সহজ শর্তে নতুন ঋণের ব্যবস্থা না হলে খেলাপি ঋণ আদায়ও কঠিন হবে।

গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানায়, ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তি তারিখে মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণ এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধার আওতায় আনা যাবে।

নীতিমালা অনুযায়ী—সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সুবিধা দেওয়া হবে।ঋণগ্রহীতাকে এককালীন পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে।প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ এ সুবিধার বাইরে থাকবে।স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের ঋণও এই সুবিধার আওতায় নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের একটি অংশ দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে এবং ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়বে।বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আর্থিক ও হিসাবগত জটিলতা রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের সুদ মূলধনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেই আয়ের ওপর সরকারকে কর পরিশোধ করা হয়েছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও বিতরণ করা হয়েছে। ফলে ইতোমধ্যে হিসাবভুক্ত আয় হিসেবে গণ্য হওয়া সুদ এখন মওকুফ করলে ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী ও মূলধনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।এ কারণে অনেক ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ধরনের আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অধিকাংশ খেলাপি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের হাতে এককালীন ঋণ পরিশোধের মতো অর্থ নেই। যদি সেই সক্ষমতা থাকত, তাহলে তারা আগে নিজেদের কারখানাই চালু করতেন।

তাদের মতে, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে কার্যকর মূলধনের জোগান সবচেয়ে জরুরি। উৎপাদন শুরু হলে আয় বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের অভাবে ৫ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য খাতের হিসাব যুক্ত করলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে।এই তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর মূলধন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, শুধু এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে বিশেষ তহবিল থেকে সহজ শর্তে নতুন ঋণ দিতে হবে। এতে বন্ধ কারখানা চালু হবে এবং ব্যাংকের খেলাপি ঋণও ধীরে ধীরে আদায় করা সম্ভব হবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনগুলো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রতিটি আবেদন নীতিমালা অনুযায়ী পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই নীতিমালা করা হয়েছে। প্রয়োজনে নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, আটকে থাকা ঋণের অর্থ উদ্ধার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণসংক্রান্ত মামলার চাপ কমাতে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে নীতিমালার কিছু অস্পষ্টতা দূর করা গেলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে এককালীন এক্সিট সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও শুধু ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে দ্রুত নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং খাত—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে