ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় প্রস্থানে চাপে শেয়ারবাজার

২০২৬ জুলাই ১১ ১৯:৩৪:২১
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় প্রস্থানে চাপে শেয়ারবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন প্রত্যাহারের প্রবণতা জুন মাসে আরও তীব্র হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত জুনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিট ৩৫৮ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসভিত্তিক বিক্রি।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বিদেশিদের মোট শেয়ার কেনার পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকা। বিপরীতে বিক্রির পরিমাণ পৌঁছায় ৩৫৮ কোটি টাকায়, ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

এর আগে মে মাসে বিদেশিদের নিট শেয়ার বিক্রি ছিল ১৬১ কোটি টাকা এবং এপ্রিলে ছিল ১২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ জুনে বিক্রির পরিমাণ মে মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং এপ্রিলের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার (রিপ্যাট্রিয়েশন) প্রক্রিয়া সহজ করলেও নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তিত দিকনির্দেশনা বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে তারা বাংলাদেশি শেয়ারে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছেন।

ডিএসইর তথ্য বলছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে বর্তমানে প্রায় ১৩০টি কোম্পানির শেয়ার থাকলেও জুনে তারা ১৯টি বড় কোম্পানিতে শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিপরীতে মাত্র ১৫টি কোম্পানিতে সীমিত পরিসরে নতুন বিনিয়োগ করেছেন।

সবচেয়ে বেশি বিক্রির চাপ পড়েছে ব্লু-চিপ বা বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর ওপর। জুনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্র্যাক ব্যাংকের প্রায় ১৮৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এতে ব্যাংকটিতে তাদের মালিকানা মে মাসের ৩৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

এছাড়া গ্রামীণফোনে ৪২ কোটি, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে ৩৫ কোটি, ম্যারিকো বাংলাদেশে ২৩ কোটি এবং রেনাটা-তে ১৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশিরা। একই সঙ্গে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটি) এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস থেকেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিদের আগ্রহ ছিল খুবই সীমিত। জুনে শাশা ডেনিমসে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, আইটিসিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং প্রিমিয়ার সিমেন্টে প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ এসেছে। এছাড়া লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও যমুনা অয়েল-এও সামান্য পরিমাণে বিদেশি অংশীদারিত্ব বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো বড় ধরনের নতুন আস্থার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং সীমিত পরিসরের পোর্টফোলিও সমন্বয়।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সিনিয়র সহসভাপতি এবং প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের ঘটনাকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন।

তিনি আরও বলেন, লভ্যাংশ ঘোষণার জন্য ব্যাংকের ন্যূনতম ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকার নতুন শর্ত এবং আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত রাখার নির্দেশনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাজারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সুস্থ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে।

মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ‘কমান্ড ইকোনমি’ বা নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ ধরনের পরিবেশে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-জোগানের পরিবর্তে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পায়, যা আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকদের কাছে বাংলাদেশি শেয়ারবাজারকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

উল্লেখ্য, বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে গত ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আনে। নতুন নির্দেশনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি শেয়ার লেনদেনের জন্য আলাদা করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়। এখন অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো সরাসরি মূলধনী মুনাফা কর কেটে অর্থ নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টর টাকা (নিটা) অ্যাকাউন্টে জমা দিতে পারে, ফলে অর্থ পুনর্বিনিয়োগ বা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। তবে এই উদ্যোগও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির প্রবণতা থামাতে পারেনি।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে