ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে আসছে আধুনিক আইনি কাঠামো

২০২৬ জুলাই ০৯ ১৯:৫৬:০৫
খেলাপি ঋণ উদ্ধারে আসছে আধুনিক আইনি কাঠামো

নিজস্ব প্রতিবেদক: খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, দীর্ঘ আইনি জটিলতা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে ধীরগতির কারণে দেশের ব্যাংক খাত বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইনের আওতায় খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ কিনে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্যও কমে যায়, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো পাওনা অর্থ উদ্ধার করতে পারে না। নতুন আইন কার্যকর হলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ দ্রুত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও বাড়বে। ইতোমধ্যে আইনটির খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এক্সিট পলিসির আওতায় মন্দ ঋণ নিষ্পত্তিতে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা ইউক্রেন ও তুরস্কের মতো কয়েকটি দেশে সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে।

গভর্নরের ভাষ্য, নতুন আইন কার্যকর হলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে টক্সিক বা খারাপ ঋণ সরিয়ে নিতে পারবে। ২০২৭ সালের মধ্যে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে কাজ শুরু করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী।

তিনি আরও বলেন, অযথা বছরের পর বছর মন্দ ঋণ ব্যালান্স শিটে রেখে দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদনের সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। তাই ব্যাংকগুলোকে রাইট-অফে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে রাইট-অফ করা হলেও ঋণগ্রহীতা দায়মুক্তি পাবেন না; ঋণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া আগের মতোই চলবে।

খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে খেলাপি, অবলোপন করা ও নন-পারফর্মিং ঋণ পুনরুদ্ধার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য সমন্বিত কোনো আইন নেই। নতুন আইন কার্যকর হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এসব সম্পদ বিক্রি, পুনর্গঠন এবং পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (ডিএএমইউ) গঠন করা হবে। প্রশাসনিকভাবে এটি স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ইউনিটটির প্রধানের পদমর্যাদা হবে ডেপুটি গভর্নরের সমান। এ পদে নিয়োগ পেতে ব্যাংকিং বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং বয়স ৬৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না।

খসড়ায় এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠনেরও বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক থেকে কেনা খেলাপি সম্পদ কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে না রেখে পৃথক ট্রাস্টে সংরক্ষণ করা হবে। ফলে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টের সম্পদের ওপর পাওনাদারেরা দাবি করতে পারবেন না। এছাড়া খেলাপি সম্পদ শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ উদ্ধার এবং আইনি সমন্বয়ের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।

ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি হিসেবে কাজ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিতে হবে। নির্ধারিত মূলধন, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ এবং ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড পূরণ বাধ্যতামূলক হবে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক রাখতে হবে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, অর্থ পাচার, প্রতারণা বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। যদিও এ ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ, শেয়ার ও বন্ড ইস্যু এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হলেও স্বার্থের সংঘাত এড়াতে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অচল সম্পদ পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে আদালতের বাইরে সম্পদ বিক্রি, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, ঋণগ্রহীতার অধিকার সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যাবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি সফলভাবে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ৮০ কোটি টাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারে। এতে ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বোঝা কমাতে পারবে। পরে প্রতিষ্ঠানটি পুরো অর্থ আদায় করতে পারলে লাভ করবে, আর ব্যর্থ হলে লোকসানের দায়ও তাদেরই বহন করতে হবে।

তার মতে, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি সরকারি না হয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে পরিচালিত হলে আরও কার্যকর হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়বে, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। তবে সফলতার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

এদিকে ব্যাংকাররাও উদ্যোগটিকে সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ছে। আদালতনির্ভর ব্যবস্থায় এ সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি। নতুন আইনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হলে ব্যাংক খাতের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে