ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

এক সময়ের ব্লু-চিপ, এখন লোকসানের অতল গহ্বরে

২০২৬ জুলাই ০৯ ১৬:১২:১০
এক সময়ের ব্লু-চিপ, এখন লোকসানের অতল গহ্বরে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের গৃহস্থালি ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারে একসময়ের অপ্রতিরোধ্য ব্র্যান্ড সিঙ্গার বাংলাদেশ এখন তীব্র আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। ২০১২ সালেও যেখানে মাত্র ৬৭০ কোটি টাকা বিক্রি করে কোম্পানিটি ৪৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা ঘরে তুলেছিল, ঠিক ১৩ বছর পর ২০২৫ সালে এসে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আয় করেও তারা ২২৫ কোটি টাকার বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, চলতি ২০২৬ সালেও এই ব্যবসায়িক মন্দাভাব থেকে বের হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

টানা লোকসানের ধাক্কায় ২০২৫ সালের আর্থিক বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ইতিহাসে প্রথমবার কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি সিঙ্গার। একই সঙ্গে কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান তার পরিশোধিত মূলধনকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাধ্য হয়ে সিঙ্গারের ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে ঝুঁকিপূর্ণ ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে।

বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সিঙ্গার বাংলাদেশের মূল সমস্যা বিক্রিতে নয়, বরং ঋণের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে। বছরজুড়ে বিক্রি সন্তোষজনক হারে বাড়লেও ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে চড়া সুদ দিতে গিয়ে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা পুরোপুরি কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। আর এ কারণেই শেষমেশ বিশাল নিট লোকসান গুনতে হয়েছে বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানটিকে।

তুর্কি বহুজাতিক জায়ান্ট আর্চেলিকের মালিকানাধীন এই কোম্পানিটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে কর দেওয়ার পর তাদের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫০ কোটি টাকারও কম। লোকসানের এই উল্লম্ফনের কারণে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) আগের বছরের ঋণাত্মক ৪ টাকা ৯১ পয়সা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ২২ টাকা ৫৬ পয়সায় ঠেকেছে।

অথচ নতুন উৎপাদন কারখানায় প্রোডাকশন শুরু হওয়ার সুবাদে ২০২৫ সালে সিঙ্গারের পণ্য বিক্রি আগের বছরের চেয়ে ১৪.৩০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা হয়েছিল। ফলে তাদের মোট (গ্রস) মুনাফাও ৪৭১ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫১৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

কিন্তু এই আয়ের আনন্দ স্থায়ী হয়নি অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের কারণে। ২০২৪ সালে যেখানে ঋণের সুদ ও আর্থিক খাতে ব্যয় ছিল ১৪৩ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩২২ কোটি টাকায়। অথচ এই সময়ে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ছিল মাত্র ৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পরিচালন মুনাফার চেয়ে সুদের ব্যবধান এতটাই বেশি ছিল যে তা পুরো লাভকে গ্রাস করেছে।

মূলধনী বিনিয়োগের ধাক্কা সামলানো এবং প্রতিদিনের ব্যবসা পরিচালনার খরচ মেটাতে সিঙ্গার পুরোপুরি স্বল্পমেয়াদি ব্যাংকিং ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা তাদের তীব্র তারল্য সংকটে ফেলেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন ব্যাংকের ওভারড্রাফটসহ সুরক্ষিত স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

এই বিশাল অর্থ জোগাতে সিঙ্গারকে একাধিক কমার্শিয়াল ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এর মধ্যে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন থেকেই নেওয়া হয়েছে ৩০৫ কোটি টাকা। এছাড়া পূবালী ব্যাংক থেকে ২৪৯ কোটি টাকা (যার মধ্যে ৯৯ কোটি টাকা ওভারড্রাফট), ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭৭ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নিয়েছে তারা।

বছরজুড়ে ব্যাংক ঋণ ও লিজের সুদ মেটাতেই সিঙ্গারকে নগদ ২৬৪ কোটি টাকা গুনতে হয়েছে। ফলস্বরূপ, ব্যাংক ওভারড্রাফটের হিসাব সমন্বয় করার পর বছরের সমাপনীতে কোম্পানির হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ঋণাত্মক ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকায় নেমে যায়।

তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছুটা আলোর রেখা দেখা গেছে কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো বা নগদ প্রবাহে। বিক্রির টাকা সময়মতো আদায় হওয়ায় ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) ঋণাত্মক ৭ টাকা ৯৬ পয়সা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পজিটিভ ১৪ টাকা ৫৬ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।

সিঙ্গার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বৈশ্বিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দামের কারণে বিক্রি বাড়লেও মোট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি এসেছে মাত্র ৪ শতাংশ। ফলে গ্রস প্রফিট মার্জিন ২৭ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নেমেছে। বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় উৎপাদন খরচের পুরো বোঝা ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব হয়নি, যদিও তারা দাবি করছে যে এই মার্জিন এখনো বাজারের অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় প্রতিযোগিতাপূর্ণ।

বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দেওয়ার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, বছরের এই বিশাল অঙ্কের নিট লোকসান এবং নতুন কারখানায় বড় মূলধনী বিনিয়োগের কারণে ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে সিঙ্গার বাংলাদেশ জানায়, বর্তমানের এই সংকট সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা ঠিকঠাক রয়েছে। নতুন অত্যাধুনিক কারখানাটি পুরোদমে চালু হলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে আসবে, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়বে এবং পণ্যের মান উন্নত করে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদা আরও দক্ষতার সাথে পূরণ করা যাবে।

তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএলের মতো দেশীয় জায়ান্টদের আগ্রাসী ব্যবসার কারণে সিঙ্গারের জন্য বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ওয়ালটনের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটর বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে একসময় সিঙ্গারের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। পাশাপাশি প্রাণ-আরএফএলও দেশজুড়ে দ্রুত শোরুম বাড়িয়ে গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

নতুন বছরের প্রথম প্রান্তিকও হতাশাজনক

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনেও সিঙ্গারের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ মেলেনি। ডিএসইতে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রথম তিন মাসে কোম্পানির মোট বিক্রি ৫৫৯ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ৫৭৮ কোটি টাকা হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি দেশীয় বাজার থেকে আসেনি, এসেছে পুরোপুরি রপ্তানি খাত থেকে। দেশের বাজারে বিক্রি ৫৫৮ কোটি থেকে কমে ৫৫৫ কোটি টাকা হলেও, রপ্তানি আয় প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে বিক্রি সামান্য বাড়লেও সিঙ্গারের পরিচালন মুনাফা ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমে ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। একই সময়ে কোম্পানির পরিচালন সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও বিক্রয় ব্যয় ১১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২৭ কোটি টাকা।

প্রথম প্রান্তিকেও সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে ঋণের সুদের খরচ থেকে। সিঙ্গারের নিট আর্থিক ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ৪৭ কোটি থেকে ৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং মোট আর্থিক খাতের ব্যয় ৭২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

ঋণের এই চড়া মাশুলের কারণে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই কোম্পানিটি বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি টাকা। এর ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসানও ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৬০ পয়সায় ঠেকেছে।

এই হতাশাজনক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর শেয়ার বাজারে সিঙ্গারকে নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সমস্ত উৎসাহ উবে গেছে। ডিএসইতে আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পরদিন সিঙ্গারের শেয়ার কেনার জন্য কোনো ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা কোম্পানির আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থার সংকটকেই স্পষ্ট করে তোলে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে