ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

শেয়ারবাজারে কাঠামোগত সংস্কারে একগুচ্ছ প্রস্তাব

২০২৬ জুলাই ০২ ২৩:২০:৩৯
শেয়ারবাজারে কাঠামোগত সংস্কারে একগুচ্ছ প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের শেয়ারবাজারকে আরও কার্যকর, শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনা, ডিএসইকে আরও ক্ষমতায়ন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) ডিএসইর মালিকানা বৃদ্ধি, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিসিবিএল) ডিএসইর নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানের দ্রুত আইপিও আনা এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এসআরও) গঠন।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ডিবিএ আয়োজিত ‘পরিচিতি ও মতবিনিময়’ অনুষ্ঠানে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনার দাবি

সাইফুল ইসলাম বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম প্রণয়নের সময় পাঁচ বছর পর এটি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১২ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি জানান, ডিবিএ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব লিখিতভাবে বিএসইসির কাছে জমা দিয়েছে। তার ভাষায়, খুব বড় ধরনের পরিবর্তন নয়; বরং এমন কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ডিএসই আরও কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে।

ডিএসইকে আরও ক্ষমতায়নের আহ্বান

ডিবিএ সভাপতি বলেন, ডিএসইকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করতে হলে শুধু ক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, এর সাংগঠনিক কাঠামোরও পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।

তার মতে, ডিমিউচুয়ালাইজেশনের আগে ডিএসই যেভাবে পরিচালিত হতো, পরবর্তীকালে সেই কাঠামো থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

সিডিবিএলে ডিএসইর মালিকানা বাড়ানোর প্রস্তাব

সিডিবিএলের মালিকানা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার সময় ডিএসই আর্থিকভাবে ততটা সক্ষম না থাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ শেয়ার গ্রহণ করতে পারেনি।

কিন্তু গত দুই দশকে সিডিবিএলের মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ডিএসইভিত্তিক কার্যক্রম থেকে। এরপরও প্রতিষ্ঠানটিতে ডিএসইর মালিকানা মাত্র ১৩ শতাংশ, যা তার মতে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ন্যায্যও নয়।

সিসিবিএলে নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব চায় ডিবিএ

সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ (সিসিবিএল) নিয়ে বক্তব্যে ডিবিএ সভাপতি বলেন, ২০১৮ সালে ডিএসই ১৩৫ কোটি টাকা সাবস্ক্রাইব করলেও প্রকল্পটির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

তিনি জানান, অন্য উৎস থেকে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি চোখে পড়েনি।

তার মতে, যেহেতু সিসিবিএলের প্রায় ৯৮ শতাংশ রাজস্ব ডিএসইভিত্তিক লেনদেন থেকে আসবে, তাই প্রতিষ্ঠানটি ডিএসইর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমানে সিসিবিএলে ডিএসইর ৪৫ শতাংশ অংশীদারত্ব যথেষ্ট নয়। এটি বাড়িয়ে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। বাকি ১০ শতাংশ সিডিবিএল বা অন্য কোনো অংশীদারের কাছে রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ নতুনভাবে পুনর্গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।

সিসিবিএল প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান

সাইফুল ইসলাম বলেন, সিসিবিএল প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর প্রায় অর্ধেক ব্যয়েই একই ধরনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি নতুন পরিচালনা পর্ষদকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার আহ্বান জানান।

সরকারি কোম্পানির আইপিও এনে সংকট নিরসনের প্রস্তাব

বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ভালো আইপিওর সংকট রয়েছে উল্লেখ করে ডিবিএ সভাপতি বলেন, বেসরকারি খাত থেকে রাতারাতি নতুন আইপিও আনা সম্ভব নয়। কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত নিলেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে অন্তত নয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগে।

এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সময়ে সরকারের মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি বছরের মধ্যেই বাজারে নতুন আইপিও আসতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সিডিবিএলকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করার আহ্বান

সিডিবিএলের তালিকাভুক্তির বিষয়টি দীর্ঘদিনের দাবি উল্লেখ করে সাইফুল ইসলাম বলেন, এটি একটি পরিপক্ব এবং অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান।

তার মতে, যখন বাজারে আইপিওর খরা চলছে, তখন সিডিবিএলের তালিকাভুক্ত না হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। প্রয়োজনে সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডিরেক্ট লিস্টিং) হলেও ডিবিএর কোনো আপত্তি নেই। তিনি দ্রুত প্রতিষ্ঠানটিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান।

বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য এসআরও গঠনের প্রস্তাব

বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সেলফ রেগুলেটরি অর্গানাইজেশন-এসআরও) গঠনেরও প্রস্তাব দেন ডিবিএ সভাপতি।

তিনি বলেন, জাপানের জাপান সিকিউরিটিজ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (জেএসডিএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফিনরা (FINRA)-এর আদলে বাংলাদেশেও এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে।

তার মতে, এতে বিএসইসি নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তদারকির দায়িত্ব এসআরও পালন করবে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপও কমবে।

কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশের পুঁজিবাজারকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নিতে হলে শুধু সূচক কিংবা দৈনিক লেনদেন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না; বরং বাজারের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিএসইসির দায়িত্বের পরিধি নিয়ে মন্তব্য

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডিবিএ সভাপতি বলেন, অতীতে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ন্ত্রক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বাজার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করেছে।

তার মতে, বাজার উন্নয়ন, নতুন আইপিও আনা কিংবা বিনিয়োগ প্রচারণা চালানো কমিশনের মূল দায়িত্ব নয়। এসব কাজ মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অন্যান্য বাজার অংশীজনদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, যদি কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক আইপিও আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন মার্চেন্ট ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তবে আইপিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের কাছেই থাকা উচিত। একইভাবে ব্রোকিং কার্যক্রম ব্রোকারদের এবং মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার দায়িত্ব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর (এএমসি) কাছেই থাকা উচিত।

ব্যয়বহুল রোডশো আয়োজন থেকে বিরত থাকার আহ্বান

সাইফুল ইসলাম বলেন, অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে রোডশোর নামে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির জন্য বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও বাধ্যতামূলকভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছিল।

তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ থেকে বিরত থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্মপরিধির মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ারসহ বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

এসএ খান

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে