ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

ডিএসইতে অরেঞ্জ ইকোনমি সামিট, টেকসই বিনিয়োগের নতুন সন্ধান

২০২৬ জুন ১৬ ১৭:৪১:৪০
ডিএসইতে অরেঞ্জ ইকোনমি সামিট, টেকসই বিনিয়োগের নতুন সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং জলবায়ু-সহনশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘অরেঞ্জ ইকোনমি সামিট ২০২৬: ঢাকা’। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (আইআইএক্স) এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সামিটে বাংলাদেশের জন্য অরেঞ্জ ক্লাইমেট ফান্ডের আওতায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেমের বিকাশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শেয়ারবাজারের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। এছাড়া সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, আর্থিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।

স্বাগত বক্তব্যে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, ডিএসই টেকসই অর্থায়ন, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অরেঞ্জ অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক উপকরণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সামিটে প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশ ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারের উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সামিটের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন আইআইএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক দুররীন শাহনাজ। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক বাজার গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি তৈরি পোশাক, কৃষি, জ্বালানি রূপান্তর এবং আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে শেয়ারবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক শাহনাজ ‘অরেঞ্জ মুভমেন্ট’-কে অন্তর্ভুক্তিমূলক শেয়ারবাজার গঠনের একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগ কাজ করছে। গত এক দশকে আইআইএক্স বাংলাদেশে ১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে দেশের প্রথম অরেঞ্জ বন্ড ইস্যুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তিনি আরও ঘোষণা করেন, আইআইএক্সের এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘অরেঞ্জ ক্লাইমেট ফান্ড’-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে উঠলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অরেঞ্জ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে।

সামিটে ‘বাংলাদেশে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম নির্মাণ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।

ড. আশিকুর রহমান উল্লেখ করেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোগত চাপ এবং ব্যাংকিং, শেযারবাজার, বন্ড ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল একটি উদ্ভাবনী অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আর্থিক সেবা খাতে এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রিন বন্ড, সোশ্যাল বন্ড এবং দেশের প্রথম অরেঞ্জ বন্ড ইতোমধ্যে একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, বাজারভিত্তিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অরেঞ্জ ক্যাপিটাল বাজার গড়ে তোলা।

পরে আইআইএক্সের বাংলাদেশে অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড পার্টনারশিপস বিভাগের পরিচালক দেবাশীষ রায়ের সঞ্চালনায় একটি আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন আইআইএক্সের সিনিয়র ডিরেক্টর (রিসার্চ অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিলেশনস) প্রিয়াঙ্ক তিওয়ারি এবং পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এম. আশিকুর রহমান। আলোচনায় বাংলাদেশে অরেঞ্জ ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের বিস্তার এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে টেকসই ও বহুমাত্রিক আর্থিক বাজার গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, অরেঞ্জ বন্ডের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণ জলবায়ু সহনশীলতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাজিদা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের প্রথম অরেঞ্জ জিরো কুপন বন্ড ইস্যুকে তিনি শেয়ারবাজারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।

এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অরেঞ্জ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। একইসঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় বৈশ্বিক বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সবশেষে ‘এক্সপেরিয়েন্স শেয়ারিং ফ্রম ইমার্জিং মার্কেটস’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। আইআইএক্সের সিনিয়র ডিরেক্টর প্রিয়াঙ্ক তিওয়ারির সঞ্চালনায় এ সেশনে অংশ নেন আইআইএক্স ইন্দোনেশিয়ার রিসার্চ অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিলেশনস বিভাগের প্রতিনিধি আন্ত্যা উইদিতা এবং আইআইএক্সের ডিরেক্টর, ইমপ্যাক্ট পার্টনারস (ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং) জোনাথন আবেউইক্রমা।

সেশনে বক্তারা উদীয়মান অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন, টেকসই বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজার উন্নয়নে অরেঞ্জ ক্যাপিটালের ভূমিকা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উত্তম চর্চা এবং সেগুলোর বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে