ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে একের পর এক অসঙ্গতি

২০২৬ জুন ১৩ ১৬:৪৬:২৯
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে একের পর এক অসঙ্গতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) লঙ্ঘন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষক। এসব কারণে কোম্পানিটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’ (Qualified Opinion) প্রদান করা হয়েছে।

কোম্পানিটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ম্যানেজিং পার্টনার মো. জাহিদুল ইসলাম এফসিএ তার নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘বেসিস ফর কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’, ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটারস’ এবং ‘অদার ম্যাটার’ শিরোনামে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একীভূত আর্থিক বিবরণীতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ২১ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৮৫০ টাকার বিনিয়োগকে শেয়ার মূলধন ও শেয়ার প্রিমিয়ামের বিপরীতে সমন্বয় করা হয়েছে, যা আইএফআরএস-১০ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি গুডউইল স্বীকৃতি না দেওয়া এবং নন-কন্ট্রোলিং ইন্টারেস্টের যথাযথ সমন্বয় না করায় একীভূত আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে। নিরীক্ষক প্রয়োজনীয় কনসোলিডেশন ওয়ার্কিং পেপার না পাওয়ায় হিসাবের যথার্থতা যাচাই করতে পারেননি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সদস্যপদের বিপরীতে ধারণ করা শেয়ার বিক্রির ফলে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ২২ হাজার ৫৩৮ টাকার ক্ষতি সঠিকভাবে মুনাফা-লোকসান হিসাবে দেখানো হয়নি। পরিবর্তে তা শেয়ার প্রিমিয়াম হিসাবে সমন্বয় করা হয়েছে, যা আইএএস-৮ এবং আইএফআরএস-৯ এর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে কোম্পানির লাভ-লোকসান সংরক্ষণ হিসাব অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে।

নিরীক্ষক জানান, কোম্পানিটি ২০০৮ সালে জমি এবং ২০১১ সালে সিএসই সদস্যপদের পুনর্মূল্যায়ন করলেও এরপর আর কোনো পুনর্মূল্যায়ন করেনি। ফলে সম্পদের বহনমূল্য বর্তমান ন্যায্য মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে সিএসই সদস্যপদসংক্রান্ত বিনিয়োগও ন্যায্য মূল্যে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি, যা আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পদ ও মুনাফার পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে।

দাবি নিষ্পত্তি সংক্রান্ত হিসাবেও গুরুতর অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। কোম্পানি ৬ কোটি ৮ লাখ ৯ হাজার ৮৪৮ টাকার আনুমানিক দায় স্বীকার করলেও দাবি সংক্রান্ত বিস্তারিত লেজার, বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ বা প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। নিরীক্ষক উল্লেখ করেন, ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪২৩ টাকার মোট দাবি পরিশোধ এবং ৬ কোটি ১৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭ টাকার পুনর্বীমা আদায়ের তথ্য আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। ফলে কোম্পানির প্রকৃত দায় এবং বছরের মুনাফার ওপর এর প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

৫ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪৫ টাকার সানড্রি ক্রেডিটরসের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সহায়ক দলিল, সাবসিডিয়ারি লেজার বা তৃতীয় পক্ষের নিশ্চয়নপত্রও সরবরাহ করতে পারেনি ব্যবস্থাপনা। ফলে এসব দায়ের অস্তিত্ব, যথার্থতা ও মূল্যায়ন যাচাই করা যায়নি।

শেয়ার ও ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। কোম্পানি ৪০ কোটি ৬৮ লাখ ৯৮ হাজার ৫৫৬ টাকা মূল্যের বিনিয়োগের বিপরীতে ৩০ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৪৪৫ টাকা বাজারমূল্য দেখিয়েছে এবং ৯ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ টাকার অবাস্তবায়িত ক্ষতি সরাসরি ইকুইটিতে সমন্বয় করেছে। অথচ আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী এ ক্ষতি মুনাফা-লোকসান হিসাবে দেখানো প্রয়োজন ছিল। ফলে করপূর্ব মুনাফা প্রায় ৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষকের মন্তব্য। এছাড়া কোম্পানির হিসাব এবং নিরীক্ষকের গণনার মধ্যে ব্যয়মূল্য ও বাজারমূল্যের উল্লেখযোগ্য অমিল পাওয়া গেছে।

সানড্রি ডেবটরস হিসেবে ২০ কোটি ৫৮ লাখ ৯২ হাজার ৪৮৮ টাকা দেখানো হলেও এর মধ্যে ১৭ কোটি ৫১ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৯ টাকা অগ্রিম আয়কর এবং বাকি অংশের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দলিলপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে এসব পাওনার আদায়যোগ্যতা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো ১২০ কোটি ৪২ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৪ টাকার এফডিআর বিনিয়োগ। কোম্পানিটির ৫৬৩টি হিসাবের মাধ্যমে ৪৬টি ব্যাংকে এই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে মোট ২৬ কোটি ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৪ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও কোনো অবচয় বা প্রভিশন রাখা হয়নি বলে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন।

একই সঙ্গে ৪৬টি ব্যাংকে রাখা এফডিআর ও ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে কোনো স্বাধীন ব্যালেন্স কনফার্মেশন পাওয়া যায়নি। এ অর্থ কোম্পানির মোট সম্পদের প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং নগদ ও নগদ সমমান সম্পদের ৯৮ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে এসব অর্থের অস্তিত্ব, সঠিকতা ও দায়মুক্ত অবস্থান সম্পর্কে নিরীক্ষক নিশ্চিত হতে পারেননি।

এছাড়া সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের কাছ থেকে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫১ হাজার ৩১৭ টাকার সুদ আয় ও পাওনা দেখানো হয়েছে, যার আদায়যোগ্যতা অত্যন্ত অনিশ্চিত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। ফলে সুদ আয় ও প্রাপ্য উভয়ই অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষক মত দিয়েছেন।

স্থায়ী সম্পদের ক্ষেত্রেও যথাযথ স্থায়ী সম্পদ নিবন্ধন (ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার) না থাকায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ৭২ হাজার ১৫১ টাকার উদ্বোধনী সম্পদ যাচাই করা যায়নি। সাতটি মোটরযানের মালিকানা এখনও উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের নামে রয়েছে এবং চারটি যানবাহন বিক্রির পক্ষে প্রয়োজনীয় দলিলও পাওয়া যায়নি। এছাড়া রাইট-অব-ইউজ সম্পদ সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি।

প্রিমিয়াম আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। রাজস্ব হিসাবে নিট প্রিমিয়াম দেখানো হয়েছে ২০ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৭৮৯ টাকা, অথচ এক্সএল ফরম ও আর্থিক প্রতিবেদনে মোট প্রত্যক্ষ ও পিএসবি প্রিমিয়াম দেখানো হয়েছে ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৬ টাকা। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে এই পার্থক্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গুরুত্বারোপ করা বিষয়সমূহ

নিরীক্ষক ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটারস’-এ উল্লেখ করেছেন, কোম্পানি শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলে (ডব্লিউপিপিএফ) কোনো অবদান রাখেনি, যা আইন লঙ্ঘনের শামিল।

এছাড়া ২০২৫ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলেও বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথক ব্যাংক হিসাবে লভ্যাংশ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কোম্পানির গ্র্যাচুইটি স্কিম থাকলেও কোনো গ্র্যাচুইটি প্রভিশন রাখা হয়নি এবং আইএএস-১৯ অনুযায়ী অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নও করা হয়নি। এর ফলে মুনাফা অতিরিক্ত এবং দায় কম দেখানো হয়ে থাকতে পারে।

বিলম্বিত কর দায় (Deferred Tax Liability) হিসাবের পক্ষে প্রয়োজনীয় করভিত্তিক হিসাবপত্র দেওয়া হয়নি। একইভাবে নগদ প্রবাহ বিবরণীর পক্ষে বিস্তারিত ওয়ার্কিংও সরবরাহ করা হয়নি।

এছাড়া সাধারণ বীমা করপোরেশনের (এসবিসি) সঙ্গে লেনদেনসংক্রান্ত ১২ কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ২৭৭ টাকা পরিশোধযোগ্য এবং ১১ কোটি ৩৯ লাখ ৮২ হাজার ৯ টাকা প্রাপ্য হিসেবে দেখানো হলেও প্রয়োজনীয় ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন না পাওয়ায় এসব হিসাবের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যান্য পর্যবেক্ষণ

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ‘অদার ম্যাটার’ অংশে বলা হয়েছে, আগের অর্থবছরে মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং কোম্পানিটির নিরীক্ষা সম্পন্ন করে কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন দিয়েছিল। অন্যদিকে সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইআইসি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী কেএম আলম অ্যান্ড কোং নিরীক্ষা করে আনকোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সিকিউরিটিজ হাউস ও প্রাইম ব্যাংকে পাঠানো ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণ চিঠিরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সার্বিকভাবে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স পিএলসির আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগত অসঙ্গতি, তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি, নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক হিসাবমান লঙ্ঘনের বিষয় উঠে এসেছে, যা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থান ও মুনাফার চিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে