ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে চরম দুরবস্থা, বিপাকে গ্রাহকরা

২০২৬ মে ৩১ ২১:২৯:৪৯
বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে চরম দুরবস্থা, বিপাকে গ্রাহকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :সাধারণ বিমা খাতে (নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স) দাবি নিষ্পত্তিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানিতে গ্রাহকদের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি দাবি বকেয়া পড়ে আছে। মোট উত্থাপিত দাবির বিপরীতে পরিশোধ হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, বাকি ৭৫ শতাংশই এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এতে বিমা খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানিতে মোট ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট দাবির ২৫ শতাংশ। বিপরীতে ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু বিমা কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে দাবি পরিশোধে গড়িমসি করলেও বকেয়া দাবির বড় কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে পুনঃবিমার অর্থ যথাসময়ে না পাওয়া। পুনঃবিমা বাবদ অর্থ আটকে থাকায় অনেক কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি করতে পারছে না। এর ফলে বিমা খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি বিমা কোম্পানিতে বিমা করা বন্ধ করে বিদেশি বিমা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে সাধারণ বিমা করপোরেশনের দাবি, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে পুনঃবিমার অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের আর্থিক সংকটে প্রতিষ্ঠানটি নেই বলেও জানিয়েছে তারা।

বকেয়ার বড় অংশ সাধারণ বিমা করপোরেশনে

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দাবি বকেয়া রয়েছে সাধারণ বিমা করপোরেশনে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে পরিশোধ হয়েছে মাত্র ২৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা মোট দাবির ১২ দশমিক ০৬ শতাংশ। ফলে বকেয়া রয়েছে ২ হাজার ১৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

বেসরকারি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি বকেয়া রয়েছে। কোম্পানিটির কাছে উত্থাপিত ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকার দাবির মধ্যে পরিশোধ হয়েছে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। বাকি ৩২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এখনো বকেয়া।

এ ছাড়া রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা পরিশোধ করে ১৪০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বকেয়া রেখেছে। প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও ১৩০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ বাকি রয়েছে।

চার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক

দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চারটি কোম্পানির পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯০ শতাংশেরও বেশি দাবি বকেয়া রয়েছে।

পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার দাবির মধ্যে মাত্র ১ কোটি ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে ৯৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ দাবি এখনো বকেয়া রয়েছে।

পিপলস ইন্স্যুরেন্স ৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ৬ কোটি ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। কোম্পানিটির বকেয়া দাবি ৮৮ কোটি ৬ লাখ টাকা, যা মোট দাবির ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বকেয়া রয়েছে ৬৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা বা ৯৩ দশমিক ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স ৭ কোটি ১০ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে ৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৯২ দশমিক ০৬ শতাংশ দাবি এখনো বকেয়া।

এ ছাড়া রিপাবলিক, স্ট্যান্ডার্ড, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ, দেশ জেনারেল, অগ্রণী, গ্লোবাল এবং মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের দাবি নিষ্পত্তির হারও ২৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

ভালো অবস্থানে কয়েকটি কোম্পানি

সব কোম্পানির চিত্র অবশ্য এক রকম নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান দাবি নিষ্পত্তিতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করে ৯৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ নিষ্পত্তি করেছে।

জনতা ইন্স্যুরেন্স ২২ কোটি ২১ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা বা ৯৫ দশমিক ২০ শতাংশ, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স ৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকার মধ্যে ৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ৯৩ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ১৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার মধ্যে ১৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা ৯০ দশমিক ৫১ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে।

ইউনিয়ন, ফেডারেল, প্রাইম ইসলামী, বাংলাদেশ জেনারেল এবং ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্সও ৮০ শতাংশের বেশি দাবি নিষ্পত্তি করেছে।

এ ছাড়া নিটল, সিকদার, রূপালী, সিটি জেনারেল, পায়োনিয়ার, এশিয়া, কন্টিনেন্টাল, সেন্ট্রাল, ক্রিস্টাল, কর্ণফুলী ও এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ৫০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করেছে।

মাঝারি অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোও সন্তোষজনক নয়

ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, তাকাফুল ইসলামী, এক্সপ্রেস, মার্কেন্টাইল ইসলামী, সেনা কল্যাণ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল, প্রভাতী, প্যারামাউন্ট, ফিনিক্স ও ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ৫০ শতাংশের নিচে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ হারও সন্তোষজনক নয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা

একটি সাধারণ বিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দাবি পরিশোধের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসা পুরো খাতের জন্য উদ্বেগজনক। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দাবি নিষ্পত্তির হার ৮০ শতাংশের বেশি থাকা উচিত। কিন্তু অনেক কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা এবং পুনঃবিমার অর্থ না পাওয়ার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তির হার ১০ শতাংশের নিচে, তাদের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে। একই সঙ্গে বিমা খাতে আস্থাহীনতার কারণে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কোম্পানির পরিবর্তে বিদেশি বিমা প্রতিষ্ঠানের সেবা নিচ্ছে।

বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাইফুদ্দীন বলেন, সার্বিকভাবে ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসার বড় অংশ পুনঃবিমা করা হয় এবং এর অর্ধেক বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ বিমা করপোরেশনে রাখতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় গ্রাহকদের দাবি পরিশোধেও সমস্যা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে সাধারণ বিমা করপোরেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল মতিন বলেন, পুনঃবিমার অর্থ পরিশোধে করপোরেশনের কোনো সমস্যা নেই। যথাযথ নথিপত্র জমা দিলে সব দাবির অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। যেসব দাবির অর্থ আটকে আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেওয়া হয়নি।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে