ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

প্রভিশন ঘাটতি ৮৪ হাজার কোটি—ইসলামী ব্যাংকের বিপদ সংকেত

২০২৬ মে ১৩ ১০:৫১:০৩
প্রভিশন ঘাটতি ৮৪ হাজার কোটি—ইসলামী ব্যাংকের বিপদ সংকেত

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নতুন করে আর্থিক চাপে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট—সব মিলিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ব্যাংকটির প্রকাশিত প্রাইস সেনসিটিভ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৭৯ পয়সা।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঋণ থেকে আয় কমে যাওয়া, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই লোকসান শুধু সাময়িক পারফরম্যান্স নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও গোপন ঋণ পরিস্থিতির বাস্তব প্রভাব এখন সামনে আসছে।

সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে মোট বিনিয়োগের ৫১ শতাংশই খেলাপি, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে একক ব্যাংক হিসেবে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই ইসলামী ব্যাংকের।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ব্যবস্থাপনার সময়ে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট বড় অঙ্কের ঋণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়েছিল, যা এখন ধাপে ধাপে প্রকাশ পাচ্ছে।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, মন্দ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) থাকার কথা ১২.৫০ শতাংশ, কিন্তু বর্তমানে এটি নেমে এসেছে ৬.৪২ শতাংশে।

নিরীক্ষকদের মতে, পূর্ণ প্রভিশন সমন্বয় করা হলে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি আরও বাড়বে।

ব্যাংকের আর্থিক সংকটের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম স্টিলস ও রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, ভেজিটেবল অয়েল এবং সুপার এডিবল অয়েল মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বকেয়া রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বড় অংশ বাজেয়াপ্ত করেছে।

টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী ব্যাংক পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে এবং শেয়ার দরও ফ্লোর প্রাইসে আটকে রয়েছে।

ব্যাংকটির নিট বিনিয়োগ আয়ও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকায় নেমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত পুনর্গঠন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে