ঢাকা, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

নাভানা ফার্মায় দখল যুদ্ধ, ফাঁদে পড়ে বরখাস্ত বিএসইসি কর্মকর্তা

২০২৬ এপ্রিল ১৯ ১৭:৩৪:৫৪
নাভানা ফার্মায় দখল যুদ্ধ, ফাঁদে পড়ে বরখাস্ত বিএসইসি কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী সরকার দেশ ছাড়ার পরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এরইমধ্যে কয়েক দফায় দখল-পূণ:দখলে নেওয়া হয়েছে কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ। যা নিয়ে তদন্তে নামে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই তদন্ত কার্যক্রম বিষয়ে অবহিত করে সহযোগিতার জন্য বিএসইসির কর্মকর্তা মোহা. ইব্রাহীম আলীকে ফাঁদে ফেলে নাভানা ফার্মা কর্তৃপক্ষ। এ করতে গিয়ে ধরা পড়ে বরখাস্ত হয়েছেন তিনি। তবে তার বিপদে এগিয়ে আসেনি নাভানা ফার্মা কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের শুরুতে নাভানা ফার্মা আবারও দখলে নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেছেন এটির পদত্যাগ করা কয়েকজন প্রভাবশালী শেয়ারধারী। তাঁরা দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন।

জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই ও তাঁর পরিবার এবং তাঁদের সহযোগী আদনান ইমাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পলাতক অবস্থা থেকেই কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেছেন। তাঁদের সহায়তা করছেন বিদ্যমান একজন শেয়ারধারী।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জানুয়ারি কোম্পানিটিতে জাভেদ কায়সার আলীকে চেয়ারম্যান, ড. সাঈদ আহমেদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মো. আমিনুল হক ভূইয়াকে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ নিয়ে নাভানা ফার্মার বর্তমান পরিচালকদের পক্ষ থেকে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) ‘জোর করে কোম্পানি’ দখলের চেষ্টার অভিযোগ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে বিএসইসি এ ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। তার ভিত্তিতে কোম্পানিটি দখলের চেষ্টার ঘটনা তদন্তে ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়া পর্যন্ত পুনর্গঠিত পর্ষদ বহাল রাখা হয়েছে।

বিএসইসির এই তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে কি হয়, না হয়, ইত্যাদি বিষয়ে অবহিত করতে বিএসইসির কর্মকর্তা মোহা. ইব্রাহীম আলীর সহযোগিতা নেন নাভানা ফার্মা কর্তৃপক্ষ। অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তাকে এ কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। যা করতে গিয়ে বিএসইসির কাছে ধরা পড়ে যান ওই কর্মকর্তা। যার ফলে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, অসদাচরণের অভিযোগে বিএসইসির সহকারী পরিচালক মোহা. ইব্রাহীম আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০২১ অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্বাক্ষরিত জারি করা এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।

অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, সহকারী পরিচালক ইব্রাহীম আলীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি ২(১), বিধি ৩৬ (আচরণ ও শৃঙ্খলা) সম্পর্কিত বিধি ৩৬(১)(ক) এবং বিধি ৪৯(খ) এর আওতায় 'অসদাচরণ' এবং উক্ত 'অসদাচরণ সম্পর্কিত বর্ণিত যেকোন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মচারী বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি ৫০ এর আওতায় চাকরি হতে বরখাস্ত কিংবা অন্য যেকোন গুরুদণ্ড আরোপ করা প্রয়োজন হবে। এ অভিযোগে ইব্রাহীম আলীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যধারা শুরু করার কমিশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

আদেশে আরো উল্লেখ করা হয়, অভিযোগের মাত্রা ও প্রকৃতি বিবেচনায় ইব্রাহীম আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা প্রয়োজন ও সমীচীন মর্মে কমিশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সেহেতু, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০২১ এর বিধি ৫৫(১) বিধি অনুসারে সহকারী পরিচালক ইব্রাহীম আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। তিনি সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকবার সময় সরকারি বিধি ও আদেশানুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।

রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে নাভানা ফার্মার দ্বন্ধ

শেয়ারবাজারের এই কোম্পানিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আর্থিক দ্বন্ধে জড়িয়েছে। এনবিআর প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১৩৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ভ্যাট দাবি করেছে। এ নিয়ে কোম্পানির পূণ:রায় তদন্তের আবেদন, শুনানি এসব চলমান রয়েছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা পর্যন্ত কোন সমাধান হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

ডিভিডেন্ডে হতাশ বিনিয়োগকারীরা

কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ শেয়ারবাজারকে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ করছে, একইভাবে ইস্যু মূল্যে তুলনায় দূর্বল ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। এ কোম্পানিটির জন্য শেয়ারবাজারে প্রতিটি শেয়ার ৩৪ টাকা করে যোগ্য বিনিয়োগকারী ও ২৪ টাকা করে সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছে ইস্যুর মাধ্যমে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এমন একটি কোম্পানির ডিভিডেন্ড ১৪ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সার মধ্যে আটকে আছে।

দেখা গেছে, কোম্পানিটিতে শেয়ারপ্রতি ৩০ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় শুধুমাত্র সাধারন শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১৪% বা শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা ডিভিডেন্ড পেয়েছে। অথচ যেকোন ব্যাংকে এফডিআর করলে ৩০ টাকায় ৩ টাকা ও ২৪ টাকায় ২ টাকা ৪০ পয়সা পাওয়া সম্ভব।

দূর্বল ডিভিডেন্ড ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ অন্ত:কলহে শেয়ার দর নেমে এসেছে অর্ধেকে। দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১২ মে নাভানা ফার্মার শেয়ার দর ছিল ১১৩ টাকা ৬০ পয়সা। যে শেয়ারটি চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল নেমে এসেছে ৫৯ টাকা ১০ পয়সায়। অর্থাৎ শেয়ারটির দর কমেছে ৫৪ টাকা ৫০ পয়সা বা ৪৮ শতাংশ।

নাভানা ফার্মার কোম্পানি সচিব আমিনুল হক ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে