ঢাকা, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

সূরা কুরাইশ: যে গোপন রহস্য আপনাকে কেউ বলেনি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০২ ১০:১৭:০২
সূরা কুরাইশ: যে গোপন রহস্য আপনাকে কেউ বলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক : সূরা কুরাইশ মক্কায় অবতীর্ণ একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ সূরা। এর আগে নাজিল হওয়া সূরা ফিল–এ আল্লাহ কাবা রক্ষার ঘটনা তুলে ধরেছেন। সূরা কুরাইশ মূলত সেই ঘটনার ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ, আল্লাহ কাবাকে রক্ষা করার পর কুরাইশ গোত্রকে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা দিয়েছেন—তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশই এই সূরার মূল বিষয়। এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ কুরাইশদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তারা যে সম্মান ও নিরাপত্তা ভোগ করছে, তা তাদের শক্তির কারণে নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

সূরার প্রথম আয়াতে “ইলাফে কুরাইশ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ইলাফ’ শব্দের অর্থ শুধু অভ্যস্ত হওয়া নয়; বরং নিরাপত্তা, শান্তি, নির্ভরতা ও স্থায়ী সুবিধা। কুরাইশরা আরব উপদ্বীপের অন্য গোত্রগুলোর তুলনায় একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করত। তারা যুদ্ধ, লুটপাট ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেও নিরাপদ ছিল। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ বোঝাতে চান—তাদের এই স্থিতিশীল জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি নিয়ামত, যা তারা অবহেলা করছে।

দ্বিতীয় আয়াতে শীত ও গ্রীষ্মের সফরের কথা বলা হয়েছে। কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মকালে শাম (বর্তমান সিরিয়া অঞ্চল)–এ বাণিজ্য কাফেলা পাঠাত। আরবের অন্য কোনো গোত্র এভাবে নির্ভয়ে দীর্ঘ সফর করতে পারত না। কুরাইশরা কাবার খাদেম হওয়ায় তাদের কাফেলায় কেউ আক্রমণ করত না। এখানে আল্লাহ ইঙ্গিত দিচ্ছেন—এই নিরাপদ বাণিজ্যই তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি, আর এই নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহই দিয়েছেন।

তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেন, “অতএব তারা যেন এই ঘরের রবের ইবাদত করে।” এখানে আল্লাহ ‘রব্বুল আলামিন’ না বলে ‘এই ঘরের রব’ বলেছেন। এর কারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুরাইশরা কাবাকে সম্মান করত, কিন্তু কাবার রব আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানত না। তারা মূর্তিপূজা করত। আল্লাহ যেন বলছেন—যে ঘরের কারণে তোমরা সম্মান, নিরাপত্তা ও জীবিকা পাচ্ছ, সেই ঘরের মালিককেই যদি অস্বীকার করো, তবে তা চরম অকৃতজ্ঞতা।

চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি তাদের ক্ষুধা থেকে খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপদ করেছেন। মানবজীবনের সবচেয়ে বড় দুই সমস্যা হলো—পেটের ক্ষুধা ও জীবনের নিরাপত্তাহীনতা। কুরাইশরা এই দুই সংকট থেকেই মুক্ত ছিল। তাদের না ছিল দুর্ভিক্ষের ভয়, না ছিল শত্রুর আতঙ্ক। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ বোঝান—যে ব্যক্তি বা জাতি এই দুই নিয়ামত পায়, তার ওপর আল্লাহর ইবাদত ফরজ হয়ে যায়।

এই সূরার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো—নিয়ামত পেলে মানুষ সাধারণত আল্লাহকে ভুলে যায়। কুরাইশরা নিরাপত্তা ও সম্পদ পাওয়ার পর আল্লাহর শোকর আদায় করেনি। আজকের যুগেও অনেক মানুষ মনে করে, অর্থনৈতিক সাফল্য ও সামাজিক নিরাপত্তা তার নিজের যোগ্যতার ফল। সূরা কুরাইশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিয়ামত আসলে পরীক্ষা, পুরস্কার নয়। আর কৃতজ্ঞতা ছাড়া নিয়ামত টিকে থাকে না।

আজ যদি কেউ নিরাপদ দেশে বসবাস করে, নিয়মিত রিজিক পায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের মধ্যে না থাকে—তবে সে কুরাইশদের মতোই আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতের মধ্যে রয়েছে। এই সূরা আমাদের শেখায়, শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, ইবাদত ও আনুগত্যই একজন মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব।

সূরা কুরাইশ মূলত একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যিনি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, নিরাপদ রেখেছেন ও রিজিক দিচ্ছেন, তুমি কি তাঁরই ইবাদত করছ? এই প্রশ্নের উত্তরই একজন মানুষের ঈমানের মান নির্ধারণ করে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর



রে