×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

“ইসলামের জন্য আমি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিয়েছিলাম”

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১৬:৫৬:০৫
“ইসলামের জন্য আমি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিয়েছিলাম”

নিজস্ব প্রতিবেদক: একজন সফল চিকিৎসক, নিশ্চিত ক্যারিয়ার এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন—সবকিছু ছেড়ে যিনি আজ বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে ইসলামের আলো পৌঁছে দিচ্ছেন, তিনি তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাওয়াহ প্ল্যাটফর্ম ‘টুওয়ার্ডস ইটার্নিটি’ (Towards Eternity)-র অন্যতম প্রধান মুখ ডা. আহমেত মিদইয়াত। ২০১৭ সালের এক মর্মান্তিক সকালে মায়ের আকস্মিক মৃত্যু কীভাবে একজন বস্তুবাদী চিন্তার চিকিৎসককে পাল্টে দিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলাম প্রচারকে পরিণত করল, সেই অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি।

২১ জুন ২০১৭: জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই সকাল

দিনটি ছিল ২০১৭ সালের ২১ জুন। সকাল ৬টায় বোনের আতঙ্কিত ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান ডা. আহমেত। মাত্র আগের দিন সামান্য সুগার বৃদ্ধির কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মা নেফিসে মিদইয়াত হঠাৎ শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। জরুরি বিভাগে সিপিআর চলাকালীন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের চরম অসহায়ত্ব উপলব্ধি করেন চিকিৎসক পুত্র। কিছুক্ষণ পরেই কর্তব্যরত চিকিৎসক এসে মায়ের মৃত্যুর খবর জানান।

৩৫ বছর বয়সে মাকে হারানোর এই তীব্র শোক ডা. আহমেতকে জীবনের গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে মা আজীবন কোরআনের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন, সেই মায়ের সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ নিজ হাতে কবরে নামিয়ে দেওয়ার সময় তিনি একটি প্রতিজ্ঞা করেন—“মা, কোরআনের যে পতাকা আপনি এত ভালোবাসতেন, আমি তা মাটিতে পড়তে দেব না। ইনশাআল্লাহ আমি এই উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে যাব।”

উদ্দেশ্যহীন জীবন থেকে কোরআনের আলোয়

ডা. আহমেতের ভাষ্যমতে, মায়ের মৃত্যুর আগে তাঁর জীবনে কোনো সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষ্য ছিল না। দিনে হয়তো দুই-একবার নামায পড়তেন, কিন্তু অবসর সময় কাটত প্লে-স্টেশনে ‘অ্যাসাসিনস ক্রিড’ গেম খেলে কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল ম্যাচ ও বিশ্লেষণ দেখে। মেডিকেল কলেজের বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর মনে বিশ্বাস নিয়ে নানা সংশয় তৈরি করেছিল।

মায়ের মৃত্যুর পর তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে পবিত্র কোরআন এবং রিসালে-ই নূরের তাফসির অধ্যয়ন শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ইউটিউবে ফাতিহ ইয়াগসির পরিচালিত তুর্কি দাওয়াহ চ্যানেল ‘টুওয়ার্ডস ইটার্নিটি’র একটি স্ট্রিট ইন্টারভিউ দেখে গভীরভাবে আলোড়িত হন। তিনি তাদের মারফতে সত্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে নিজের সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের যৌক্তিক উত্তর খুঁজে পান।

ডাক্তারি পেশা ত্যাগ ও দাওয়াহতে পূর্ণ আত্মনিয়োগ

দুই সন্তানের পিতা হিসেবে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকায় শুরুতে সার্বক্ষণিক দাওয়াহতে যুক্ত হওয়া কঠিন ছিল। তবে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করার পর অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর জন্য আয়ের বিকল্প ও স্বাধীন পথ খুলে যায়। এরপরই তিনি ডাক্তারি পেশা থেকে স্থায়ীভাবে পদত্যাগ করেন এবং ‘টুওয়ার্ডস ইটার্নিটি’র প্রতিষ্ঠাতা ফাতিহ ইয়াগসির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দলের মূল দায়িত্বে আসেন।

তুর্কি দলের মধ্যে ইংরেজি ভাষায় সাবলীল বক্তার অভাব থাকায় ডা. আহমেত ইংরেজি বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বমঞ্চে প্ল্যাটফর্মটির ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।

একটি ছোট কামরা থেকে বৈশ্বিক বিপ্লব: স্প্যানিশ শিল্পীর ইসলাম গ্রহণ

২০১০ সালে মাত্র ১৫০ বর্গমিটারের একটি সাধারণ ফ্ল্যাট, সস্তা ক্যামেরা এবং নড়বড়ে ট্রাইপড নিয়ে শুরু হওয়া ‘টুওয়ার্ডস ইটার্নিটি’ আজ বিশ্বজুড়ে একটি বিশাল প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে:

১৩টিরও বেশি ভাষায় কনটেন্ট: ইংরেজি (প্রায় ৩১ লাখ সাবস্ক্রাইবার), আরবি (১২ লাখের বেশি), উর্দু, রুশ, স্প্যানিশ, ফরাসি, বাংলাসহ মোট ১৩টি ভাষায় তাদের ভিডিও প্রচারিত হচ্ছে।

অনন্য উদাহরণ (পেদ্রোর ইসলাম গ্রহণ): স্প্যানিশ চ্যানেলের জন্য কোনো মুসলিম ডাবিং শিল্পী না পেয়ে পেদ্রো নামের এক খ্রিস্টান কণ্ঠশিল্পীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের তুলনামূলক পর্যালোচনার স্ক্রিপ্টগুলো ডাবিং করতে করতে তিনি ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে লাইভ ভিডিও কলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ (শাহাদা পাঠ) করেন।

মাল্টি-ট্র্যাক অডিও ফিচার: বিশ্ববিখ্যাত ইউটিউবার ‘মিস্টার বিস্ট’-এর আদলে ইউটিউবের আধুনিক ‘মাল্টি-ট্র্যাক অডিও’ সুবিধার মাধ্যমে একটি ভিডিওতেই বিভিন্ন ভাষায় অডিও যুক্ত করে বিশ্বব্যাপী বৈপ্লবিক সাড়া ফেলেছে তারা।

তাকদীর ও উম্মাহর প্রতি বার্তা

ডা. আহমেত মিদইয়াত বিশ্বাস করেন, জীবনের প্রতিটি বাধা, শোক ও ঘটনাই ছিল আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার (তাকদীর) অংশ। আল্লাহ তাঁকে ধাপে ধাপে এই দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করছিলেন।

বিশ্বের সকল মুসলিমের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন—বিশ্বের ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে মাত্র ২ বিলিয়ন মুসলিমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করাই কি যথেষ্ট? বাকি ৬ বিলিয়ন অমুসলিম, যাঁরা প্রতিদিন না জেনে অনন্ত পরকালের ক্ষতির মুখে পতিত হচ্ছেন, তাঁদের কাছে ইসলামের সত্য পৌঁছে দেওয়ার দায়ভার কে নেবে? নিজের জীবনকে কেবল জাগতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ না রেখে ইসলামের দাওয়াতকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে প্রতিটি মুসলিমকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর

উ
প
রে