×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

১০ বিষয়ে ফেল, তবু ফলাফলে জিপিএ-৫!

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১৬:২৮:৫৫
১০ বিষয়ে ফেল, তবু ফলাফলে জিপিএ-৫!

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসছে। কখনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই শিক্ষার্থীরা পেয়েছে জিপিএ-৫, আবার কখনো ১০টি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েও ফলাফলে এসেছে সর্বোচ্চ জিপিএ। এসব ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের ফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে বারবার এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এসব অনিয়মের যথাযথ বিচার না হলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও পুনর্নিরীক্ষণের সময় দেখা যায়, সে ১০টি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছে। নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীকে পাস করানোর অভিযোগে গত ২৯ অক্টোবর বোর্ডের তিন কম্পিউটার অপারেটরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেও ১৭ জন শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় তৎকালীন বোর্ড সচিব অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র নাথের ছেলের ১১টি বিষয়ে নম্বর পরিবর্তনের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে। পরে এ ঘটনায় মামলা হয় এবং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় গড়ায়।

২০২৬ সালের ফল জালিয়াতির ঘটনায় চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার আসামিরা হলেন—কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), স্ক্যানিং অপারেটর মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০), কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান (৩২) এবং ফল জালিয়াতির সুবিধাভোগী ১৭ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী।

বোর্ডের সচিব জানান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ এবং অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের পরামর্শ নিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি শনাক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী, উত্তরপত্র স্ক্যান করার সময় দুটি মেশিনের ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে কৌশলে নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মাত্র দুজন প্রোগ্রামার দিয়ে পরিচালিত হতো কম্পিউটার শাখার কার্যক্রম। পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত কাজের চাপ সামাল দিতে দৈনিক ভিত্তিতে আরও ৮ থেকে ১০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে অস্থায়ী কর্মী দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করায় ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর কম্পিউটার শাখার কার্যক্রম নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানিয়েছেন, আগের প্রশাসনের সময়কার বিভিন্ন অনিয়মের দায়ও এখন বর্তমান কর্তৃপক্ষের ওপর এসে পড়েছে।

এর আগে তৎকালীন বোর্ড সচিব অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র নাথের ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফল পরিবর্তনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তিনি কারাগারেও ছিলেন। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বর্তমান বোর্ড সচিব।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ারা আলম মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বোর্ডে দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর এবং কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা কঠিন হবে।

ফল জালিয়াতির ঘটনায় কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বোর্ড সচিব জানান, এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। উত্তরপত্রগুলো বোর্ডের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত কর্মকর্তারা চাইলে সেগুলো হস্তান্তর করা হবে।

তিনি আরও জানান, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এবং অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টদের পরামর্শে স্ক্যানিংয়ের সময় ১২টি উত্তরপত্রে সমস্যা শনাক্ত করা হয়। পরে সমাধানের নামে ফলাফল জালিয়াতি করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মতামতে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুটি মেশিন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী এ প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেয়েছে, তাদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।

বোর্ডের ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করে সচিব বলেন, বর্তমান মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা হলো, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একের পর এক ফল জালিয়াতির ঘটনা দেশের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে