×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

সাক্ষীর চেয়ার ঘোরানো নিয়ে ট্রাইব্যুনালে উত্তেজনা, পরে যা ঘটল

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১৬:২২:৫৮
সাক্ষীর চেয়ার ঘোরানো নিয়ে ট্রাইব্যুনালে উত্তেজনা, পরে যা ঘটল

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানি চলাকালে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সাক্ষীকে জেরা করার সময় প্রসিকিউশনের এক সদস্যের ‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে প্রসিকিউশনের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ট্রাইব্যুনাল উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেন।

রোববার (৮ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। এদিন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৩ নম্বর সাক্ষীকে জেরা করছিলেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

আসামিপক্ষে সাক্ষীকে জেরা করেন আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরীসহ অন্য আইনজীবীরা। অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, গাজী এমএইচ তামিম ও সহিদুল ইসলাম সরদারসহ সংশ্লিষ্টরা।

জেরার একপর্যায়ে আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় সাক্ষীর কাছে ২০২৪ সালে হাইকোর্টের একটি রায় সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে সাক্ষী জানান, ওই রায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই।

সাক্ষী আরও বলেন, একই দিনে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে একটি আবেদন করা হয়েছিল। তবে সেটিকে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের একটি ‘মনভোলানো কৌশল’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরে ওই মামলার শুনানির তারিখ জানতে চাইলে সাক্ষী তা মনে করতে পারেননি।

এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের কয়েকটি প্রশ্নে প্রসিকিউশন আপত্তি জানায়। একপর্যায়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকেই জেরা করা হোক, তারা বসে যাবেন।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল তাকে ডায়াসে এসে বক্তব্য দিতে বলেন। সেখানে মুনসুরুল হক অভিযোগ করেন, প্রসিকিউশনের কেউ দাঁড়িয়ে গেলে সাক্ষীর মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়। এতে সাক্ষী সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন পড়ে শোনান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর আবারও সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

জেরার একপর্যায়ে কাঠগড়ায় বসা সাক্ষীকে উদ্দেশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে প্রসিকিউশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে উত্তর দিতে বলেন। জবাবে সাক্ষী বলেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমি সরে যাই।’ এরপর তিনি নিজের চেয়ার ঘুরিয়ে নেন।

সাক্ষীর এমন আচরণের পর প্রসিকিউশনের এক সদস্য মন্তব্য করেন, ‘জেন-জি ক্ষেপে গেলে বিপদ আছে।’ এ মন্তব্যে তাৎক্ষণিক আপত্তি জানান আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায়। তিনি এটিকে এক ধরনের হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জেরা করা কঠিন।

এ নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল হস্তক্ষেপ করে উভয়পক্ষকে শান্ত ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় আবারও সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উসকানি ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক জড়িত ছিলেন।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে তারা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯ জুলাইয়ের একটি ফোনালাপে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ওই রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

দ্বিতীয় অভিযোগে ২৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

চতুর্থ অভিযোগে ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এলাকায় আকাশ, সেতু ও আলভীসহ ১২ জনকে হত্যার ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ব্যর্থ করতে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন মিরপুর-২, মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১৩ এলাকায় আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির ও রিতাসহ ১৬ জন নিহত হন।

তবে এসব অভিযোগের বিচার এখনো ট্রাইব্যুনালে চলমান। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে