×
ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চ খেলাপি ও দুর্বল ব্যাংকে ধাক্কা খাচ্ছে মুদ্রানীতি

২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৬:৫৩:৫৭
উচ্চ খেলাপি ও দুর্বল ব্যাংকে ধাক্কা খাচ্ছে মুদ্রানীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কেবল মুদ্রানীতির ওপর ভর করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়; এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার, কঠোর রাজস্ব শৃঙ্খলা, নমনীয় বিনিময় হার এবং আমদানি শুল্ক কমানোর মতো বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ভবনে আয়োজিত ‘১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন (এবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধন পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এই মতামত ব্যক্ত করেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জন পিসুমে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাই সরকার এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বক্তব্য প্রদান করেন।

পিআরআই চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে, নাজুক ব্যাংকিং অবকাঠামো, লাগামহীন খেলাপি ঋণ, তীব্র মূলধন ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাবের কারণে প্রচলিত মুদ্রানীতির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন করা, প্রকৃত উৎপাদনমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সার্বিক সুশাসন ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ভয়াবহ প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতির মুখে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সুবিধা গ্রহণ ও নামসর্বস্ব ঋণ এবং খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতির কারণেই আজ ব্যাংকগুলোতে এই পাহাড়সম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে, যা মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা।

মূল্যস্ফীতির বিষয়ে তিনি বিশ্লেষণ করে জানান, দেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ কেবল অতিরিক্ত চাহিদা নয়। বরং এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় মুদ্রার বড় অঙ্কের অবমূল্যায়ন, খাদ্য ও জ্বালানির লাগামহীন দর এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা কাঁচামালের চড়া দাম। ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমায় আমদানির খরচ এবং তার ওপর আরোপিত শুল্কের প্রকৃত চাপ দুই-ই বহুগুণ বেড়েছে। তাই মুদ্রানীতি প্রয়োজন হলেও তা একা মূল্যস্ফীতি থামাতে পারবে না; রাজস্বনীতি, মুদ্রামান ও সরবরাহ শৃঙ্খলের যৌথ সমন্বয় প্রয়োজন।

জাইদি সাত্তার স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকার তাদের বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে মুদ্রানীতির স্বাধীন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। তাই রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সঠিক সমন্বয় জরুরি এবং কোনোভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরকারের ঘাটতি মেটানোর প্রাথমিক হাতিয়ার করা উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিশাস্ত্রের ‘মুন্ডেল-ফ্লেমিং মডেল’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, নির্দিষ্ট, নমনীয় ও নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার ব্যবস্থায় নীতিসমূহের প্রভাব ভিন্ন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির ধরন অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিনিময় হার পরিচালনা করা আবশ্যক। উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ২০২২ সালের মে মাসে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা লাফিয়ে ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে—অর্থাৎ টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশে ঠেকেছে, যা সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিয়েছে।

এই সংকট নিরসনে তিনি ‘ক্ষতিপূরণমূলক অবমূল্যায়ন’ (Compensatory Devaluation) নীতি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, মুদ্রার অবমূল্যায়নের ধাক্কা সামলাতে আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো উচিত। এতে করে আমদানিকৃত কাঁচামালের খরচ কমবে, স্থানীয় উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত হবে।

পরিশেষে ড. জাইদি সাত্তার সতর্ক করে বলেন, জরাজীর্ণ ব্যাংকিং খাত নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শুধু চড়া সুদের হার দিয়ে মূল্যস্ফীতি দমানোর পথও টেকসই নয়। অর্থ খাতের স্থিতিশীলতা ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যাংকের হিসাব পুনর্গঠন, রাজস্ব শৃঙ্খলা, সুশাসন ও শুল্ক হ্রাসের সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে