×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

‘মা-আম্মা’, ‘জল-পানি’ নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্যে দুই বাংলায় বিতর্ক

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৯:১৬:২৪
‘মা-আম্মা’, ‘জল-পানি’ নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্যে দুই বাংলায় বিতর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলা ভাষায় ‘মা’ ও ‘আম্মা’ কিংবা ‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপে আয়োজিত জনসভায় তিনি ‘মা’কে ‘আম্মা’ এবং ‘জল খাব’কে ‘পানি খাব’ বলার বিষয়ে আপত্তি জানান বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর এমন মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন দুই বাংলার ভাষাপ্রেমী ও সচেতন মহলের একাংশ।

২৪ অক্টোবর কাকদ্বীপের ওই সভায় শুভেন্দু অধিকারী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তীব্র আক্রমণ করেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি অতীতে মা কালীর প্রতিমা প্রিজন ভ্যানে তোলার ঘটনা সামনে আনেন। এ ঘটনার জন্য আগের প্রশাসনকে দায়ী করে মমতার সমালোচনা করেন তিনি।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি ভাষার শব্দচয়ন নিয়ে তাঁর কথিত মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বাংলা ভাষায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিছু শব্দকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, ভাষার স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করা হলে তা সামাজিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ভাষাপ্রেমীদের একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলা কোনো একক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভাষা নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে এ ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এবং স্থানীয় বিভিন্ন ভাষা থেকে আসা অসংখ্য শব্দ বাংলার শব্দভান্ডারে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে একই অর্থ প্রকাশে একাধিক শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এই বৈচিত্র্যের উপস্থিতি রয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন ভাষাগত উৎস থেকে আসা শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। ‘জল’ ও ‘পানি’—উভয় শব্দই বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দভান্ডারের অংশ। অঞ্চল, সামাজিক পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভ্যাস অনুযায়ী এসব শব্দের ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে।

এমনকি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্যভাষাতেও ‘গঙ্গাজল’-এর পাশাপাশি ‘গঙ্গাপানি’ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। আবার দৈনন্দিন আবেগ প্রকাশে ‘চোখের পানি’ অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দবন্ধ। ভাষাবিষয়ক আলোচনায় সমালোচকদের বক্তব্য, এসব শব্দকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্য উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক সমস্যা থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে ভাষা ও ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। তাঁদের মতে, নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের উদ্দেশ্যে শব্দের ব্যবহারকে পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত করার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

বিশেষ করে ‘মা’ ও ‘জল’ শব্দকে হিন্দু পরিচয়ের এবং ‘আম্মা’ ও ‘পানি’ শব্দকে মুসলিম পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এ ধরনের বিভাজন বাংলা ভাষার বহুত্ববাদী চরিত্র এবং স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে