×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

আয়কর রিটার্ন না দিলেই পেতে হবে ৬ শাস্তি

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৮:২৭:৫৯
আয়কর রিটার্ন না দিলেই পেতে হবে ৬ শাস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে করদাতাদের আর্থিক জরিমানা, অতিরিক্ত করের বোঝা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণে জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। আয়কর আইন অনুযায়ী, যাঁদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাঁরা নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।

দেশে বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা সোয়া কোটির বেশি। তবে তাঁদের সবাই প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দেন। বাকি বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারীর মধ্যে কারও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে আইনগতভাবে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে।

শুধু টিআইএন থাকলেই সবার জন্য একইভাবে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হয় না। তবে আয়কর আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়া প্রয়োজন, তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা দাখিল করতে হয়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা পিএসআর (Proof of Submission of Return) দেখাতে হয়। আইন অনুযায়ী এ ধরনের সেবার সংখ্যা ৪৫টি।

রিটার্ন না দিলে যেসব শাস্তি ও জটিলতা হতে পারে

১. জরিমানা গুনতে হতে পারে

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্ধারিত রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। সাধারণভাবে জরিমানার পরিমাণ সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্যকৃত করের ১০ শতাংশ হতে পারে, তবে সর্বনিম্ন জরিমানা এক হাজার টাকা। রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা করদাতার পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। আগে কখনো আয়কর নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ হাজার টাকা। আগে কর নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ৫০ শতাংশ অথবা এক হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই সীমা প্রযোজ্য হতে পারে। ফলে সবার ক্ষেত্রে সরাসরি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হবে, এমন নয়।

২. দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে বাড়তি কর দিতে হতে পারে

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে রিটার্ন জমা দিলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। করদাতা কখন রিটার্ন দিচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে কোন বিধান প্রযোজ্য হচ্ছে, তার ওপর অতিরিক্ত করের পরিমাণ নির্ভর করে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিলের সময় পরিশোধযোগ্য করের ১০ শতাংশ অথবা পাঁচ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হয়। কর কর্তৃপক্ষের নোটিশের পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত করের হার আরও বেশি হতে পারে।

৩. বকেয়া করের ওপর অতিরিক্ত অর্থের চাপ

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করা এবং কর পরিশোধে বিলম্বের কারণে অতিরিক্ত আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে। প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী, বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ হতে পারে; এ ক্ষেত্রে বিলম্বের সময় ও আইনে নির্ধারিত সীমা বিবেচনা করা হয়। ফলে রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্ব হলে করদাতার মোট আর্থিক দায় বেড়ে যেতে পারে।

৪. কর রেয়াত ও ছাড়ের সুবিধা সীমিত হতে পারে

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্য কর রেয়াত বা অন্যান্য কর-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। সঞ্চয়পত্রসহ সরকার নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে কর ছাড় পেতে হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও শর্ত পূরণ করতে হয়। বিলম্বিত রিটার্নের ক্ষেত্রে কর হিসাব করার সময় নির্দিষ্ট কর-সুবিধা সীমিত হতে পারে বা তা প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ফলে করদাতাকে তুলনামূলক বেশি কর দিতে হতে পারে।

৫. গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি

আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর কর্তৃপক্ষের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বা অন্যান্য পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যেক রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না; সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা না দিলে করদাতার জন্য এ ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

৬. বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণে সমস্যা

নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ফলে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র না থাকলে সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণ, অনুমোদন বা দাপ্তরিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে বেতন-ভাতা আটকে যাওয়ার বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়; সংশ্লিষ্ট চাকরি, সেবা ও আইনি বিধান অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত হয়।

যাঁদের আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করেছে, যাঁদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পূর্ববর্তী কর নির্ধারণ বা অন্যান্য শর্তের কারণে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, এবং যাঁদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন—তাঁদের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে, শুধু টিআইএন থাকার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই বাধ্যবাধকতা বা একই ধরনের জরিমানা প্রযোজ্য হয় না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা যায়। রিটার্ন জমা দেওয়ার পর সিস্টেম থেকে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা সংশ্লিষ্ট সনদ ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে, যাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক, তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রিটার্ন না দিলে জরিমানা, অতিরিক্ত কর, কর-সুবিধা হারানো এবং প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণে জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কী শাস্তি প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে করদাতার পরিস্থিতি, প্রযোজ্য আইন এবং কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে