×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

এবার ইসরায়েলে ঝুঁকছে বাংলাদেশ 

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৭:৫১:০৬
এবার ইসরায়েলে ঝুঁকছে বাংলাদেশ 

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংক ও চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যের বরাত দিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ইসরায়েল থেকে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার পণ্য আমদানির খবর সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও আমদানি করা পণ্যটি মানুষের খাওয়ার তেল নয়; বরং মাছ ও পোল্ট্রি ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত অপরিশোধিত মাছের তেল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক, আমদানি নীতিমালা এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।

তবে আমদানির পরিমাণ, পণ্যের প্রকৃত উৎস, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে মূল সরকারি নথি ও কাস্টমসের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

আমদানি করা পণ্যটি অপরিশোধিত মাছের তেল, যার এইচএস কোড ১৫০৪.২০। এ ধরনের তেল মাছ ও পোল্ট্রি খাদ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে এটি সরাসরি মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

গাজীপুরের একটি ফিড মিলের মালিক দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারীর মাধ্যমে প্রায় ৪০ টন মাছের তেল আমদানি করেন। পণ্যের গুণগত মান, প্রোটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের উপাদান এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

পেরু বা ভিয়েতনামের তুলনায় ইসরায়েলি পণ্যের প্রতি টনে প্রায় ৫০০ ডলার কম দাম পাওয়া যাচ্ছিল। তবে এই মূল্যপার্থক্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট চালানের ইনভয়েস, পণ্যের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের দরপত্র বা মূল্যতথ্য প্রয়োজন।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁচামালের দাম, গুণগত মান, সরবরাহের নিশ্চয়তা ও পরিবহন ব্যয় আমদানির উৎস নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোনো পণ্য কম দামে পাওয়া গেলেই তার আমদানি আইনসম্মত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর কার্যকর নিষেধাজ্ঞা এবং আমদানির অনুমোদনসংক্রান্ত শর্তও বিবেচনা করতে হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে কোনো পণ্যের বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ পাওয়া এবং কোনো রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া এক বিষয় নয়।

২০২১ সালে বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট থেকে ‘Except Israel’ কথাটি বাদ দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল বলে সরকারি ব্যাখ্যায় জানানো হয়। শুধু এই বাক্য বাদ দেওয়াকে ইসরায়েলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

একইভাবে, কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যানে সেই দেশ থেকে পণ্য আমদানির তথ্য দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপত্তিস্থল, বিক্রেতা, মধ্যস্থতাকারী এবং অর্থ পরিশোধের পথ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়।

বাংলাদেশের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২৪-এ ইসরায়েল থেকে পণ্য আমদানির বিষয়ে দেশটির নাম আলাদাভাবে নিষিদ্ধ উৎসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে এই দাবির আইনি তাৎপর্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের কার্যকর আমদানি নীতি আদেশ, পরবর্তী সংশোধনী এবং অন্য কোনো প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কোনো দেশের নাম নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ তালিকায় না থাকলেই সেখান থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। পণ্যের ধরন, আমদানি-সংক্রান্ত অনুমতি, কাস্টমস বিধি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নিয়ম এবং কার্যকর নিষেধাজ্ঞা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

কাস্টমসের দায়িত্বও কেবল পণ্যের উৎস দেখে তা আটকানো বা ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঘোষণাপত্র, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, উৎপত্তির প্রমাণপত্র, শুল্ক ও কর এবং প্রযোজ্য আইন অনুসারে চালান যাচাই করা হয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সরকারি নথি ছাড়া কাস্টমসের আইনগত এখতিয়ার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের বিক্রেতা, রপ্তানিকারক, চালানের মধ্যবর্তী গন্তব্য এবং প্রকৃত উৎপত্তির দেশ এক নাও হতে পারে। কোনো পণ্য দুবাইয়ের ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিক্রি বা অন্য বন্দরের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হলেও তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্যটির উৎপত্তির দেশ বদলে যায় না।

পণ্যের উৎপত্তি নির্ধারণে প্রযোজ্য কাস্টমস বিধি, উৎপত্তি সনদ এবং পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের তথ্য বিবেচনা করা হয়। শুধু পুনঃপ্যাকেজিং বা ট্রানজিটের কারণে সব ক্ষেত্রে উৎপত্তির দেশ পরিবর্তিত হয় না। তবে কোনো তৃতীয় দেশে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে উৎপত্তি নির্ধারণের ফল ভিন্ন হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাঠামোয় উৎপত্তির নিয়ম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নথিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সব পরিস্থিতিতে একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট পণ্য, বাণিজ্যব্যবস্থা ও বাংলাদেশের কার্যকর কাস্টমস বিধান অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করতে হয়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি ব্যাংকিং সম্পর্ক না থাকলে অনেক সময় তৃতীয় দেশের ব্যাংক, ট্রেডিং হাউস বা সরবরাহকারীর মাধ্যমে লেনদেন পরিচালিত হয়। দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো বাণিজ্যকেন্দ্র আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে লেনদেন করলেই কোনো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া বৈধ হয়ে যায় না। লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত পক্ষ, পণ্যের উৎস, ব্যাংকের কমপ্লায়েন্স নীতি এবং প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা যাচাই করা প্রয়োজন। আলোচ্য আমদানির অর্থ পরিশোধ কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং নথি ও আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করতে হবে।

একই সময়ে ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আমদানি বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান থেকে জাফরান ও শুকনো ফল এবং পাকিস্তান থেকে সুতা ও ডেনিম কাপড়ের মতো পণ্য আমদানির তথ্য আলোচনায় এসেছে।

আফগানিস্তান থেকে আমদানি ২৮৩ গুণ বেড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে শতকরা বা গুণগত বৃদ্ধির হার বুঝতে আগের বছরের আমদানির পরিমাণ জানা গুরুত্বপূর্ণ। ভিত্তিবছরে আমদানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকলে পরবর্তী সময়ে তুলনামূলক সামান্য আমদানিতেও বৃদ্ধির হার অনেক বড় দেখাতে পারে। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিকে ‘বেস ইফেক্ট’ বলা হয়।

তাই শুধু বৃদ্ধির হার দেখে কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত আমদানি মূল্য, পণ্যের পরিমাণ এবং একাধিক বছরের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ইসরায়েল থেকে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার পণ্য আমদানির পরিমাণকে বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানির তুলনায় নগণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মোট আমদানির তুলনায় অঙ্কটি ছোট হতে পারে; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পণ্যের উৎপত্তি, আমদানি নীতিমালা বা কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নগুলো গুরুত্বহীন।

এ ধরনের ঘটনা বিশ্লেষণে অন্তত তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, আমদানির তথ্য ও পণ্যের উৎপত্তি সরকারি নথিতে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, আমদানিটি সংশ্লিষ্ট সময়ের কার্যকর আইন ও নীতিমালা মেনে সম্পন্ন হয়েছে কি না। তৃতীয়ত, বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্যকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে কি না।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েল থেকে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার পণ্য আমদানির খবর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তি নির্ধারণ এবং আমদানি নীতিমালা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে প্রকৃত ঘটনা ও এর আইনি অবস্থান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল পরিসংখ্যান, চট্টগ্রাম কাস্টমসের চালান-সংক্রান্ত নথি, আমদানি নীতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে