×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংকে বাড়ছে আমানত, কমছে সুদ; চাপে সঞ্চয়কারীরা

২০২৬ অক্টোবর ২০ ২১:৫০:০৬
ব্যাংকে বাড়ছে আমানত, কমছে সুদ; চাপে সঞ্চয়কারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও ব্যাংকে টাকা রেখে স্বস্তিতে নেই সঞ্চয়কারীরা। দেশের কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের হার কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ফলে সুদ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছেন না আমানতকারীরা। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ও সুদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা আর্থিক চাপে পড়ছেন।

গত সপ্তাহে কয়েকটি ব্যাংক দ্বিতীয় দফায় আমানতের সুদ কমিয়েছে। দুই মাসের মধ্যে এসব ব্যাংক সুদের হার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতে সুদের হার ছিল ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ। আগস্টে তা নেমে আসে ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশে। বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংকে এই হার আরও কমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

১০ লাখ টাকা এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতে রাখলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে বছরে মোট ৭৫ হাজার টাকা আয় হবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হওয়ায় এই আয় দিয়ে টাকার ক্রয়ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে কর, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হলে প্রকৃত আয় আরও কমে যাবে।

ব্যাংকারদের মতে, আমানত বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্যের কারণে সুদের হার কমছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকার সময়ে আমানতের সুদ কমে যাওয়ায় বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চাপে পড়বেন। পর্যাপ্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর নতুন আমানত সংগ্রহে বেশি সুদ দেওয়ার প্রয়োজনও কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কামাল মুজেরি বলেন, ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়লে আমানতও বাড়ে, ফলে সুদের হার কমতে পারে। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এর ফলে ঋণের সুদ কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এতে আমানতকারীদের আয় কমবে।

আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা কম

ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কয়েকটি বড় ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ১৫ থেকে ২২ শতাংশ। অন্যদিকে আগস্ট পর্যন্ত পুরো ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সংকটে থাকা ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের একাংশ তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে টাকা সরিয়ে নেওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত বেড়েছে।

বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক এক বছর মেয়াদি আমানতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংক সুদ কমিয়েছে ৫০ বেসিস পয়েন্ট এবং ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ১০০ বেসিস পয়েন্ট। প্রাইম ব্যাংকের সুদের হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, ব্যাংকিং খাতে অগ্রিম আমানত অনুপাত বা এডিআর প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত রয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

সোহেল আর কে হুসেইনের মতে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ট্রেজারি কর্মকর্তা জানান, ঋণের সুদ ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকায় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ছে

ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। ব্যাংকারদের মতে, সরকারি সিকিউরিটিজের চাহিদা বাড়ায় গত সপ্তাহে ট্রেজারি বিলের সুদের হার তিন বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। তবে গতকাল ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩২ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সোনালী ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ায় ট্রেজারি বিলের সুদের হার বেড়েছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের হার নিম্নমুখী রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে আমানত বৃদ্ধি, বেসরকারি ঋণের দুর্বল চাহিদা ও অতিরিক্ত তারল্য ব্যাংকের সুদ কমানোর প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ঋণগ্রহীতারা কিছুটা সুবিধা পেলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম সুদ পাওয়ায় সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে