×
ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

দেশে টিকার সুরক্ষা বলয়ে বড় ফাটল, সাড়ে ৮ লাখ শিশু ঝুঁকিতে!

২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১১:৪৮:১৪
দেশে টিকার সুরক্ষা বলয়ে বড় ফাটল, সাড়ে ৮ লাখ শিশু ঝুঁকিতে!

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় বিশ্বজুড়ে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের জন্য প্রশংসিত হয়েছিল বাংলাদেশ। নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও অর্জন করেছিল দেশটি। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে, টিকাদানের আওতা ধরে রাখা এবং বাদ পড়া শিশুদের কর্মসূচির আওতায় আনার ক্ষেত্রে নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর ফলে হাম, রুবেলা, ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশির মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

দেশি-বিদেশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ‘যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল’ (Joint Independent Evaluation Team)-এর পর্যালোচনায় টিকাদান কর্মসূচির বিভিন্ন দুর্বলতার বিষয় উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ, গ্যাভি (Gavi) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (CDC) বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই মূল্যায়নে টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার, জনবল, টিকা সংরক্ষণ এবং কর্মসূচি পরিচালনার সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ছিল ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৩ সালে এ হার কমে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

একটি শিশুর টিকাদানের অগ্রগতি মূল্যায়নে বিসিজি (BCG), পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার তৃতীয় ডোজ (Penta-3) এবং হাম-রুবেলার (MR) টিকা গ্রহণের মতো সূচক বিবেচনা করা হয়। এসব টিকা বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট শিশুর সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের আওতা কমে গেলে শুধু টিকা না পাওয়া শিশুরাই ঝুঁকিতে পড়ে না; কোনো এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত না থাকলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। এ কারণে হামসহ অত্যন্ত সংক্রামক রোগের বিস্তার ঠেকাতে উচ্চ টিকাদান কভারেজ বজায় রাখা জরুরি।

মূল্যায়নে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হিসেবে উঠে এসেছে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হাম-রুবেলার টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হাম-রুবেলার টিকার আওতার বাইরে ছিল।

এ ধরনের ঘাটতিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘ইমিউনাইজেশন গ্যাপ’ বা টিকাদানের ব্যবধান হিসেবে বিবেচনা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকা না পেলে কোনো এলাকায় রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। পর্যাপ্ত টিকাদান না থাকলে কোনো এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশির মতো রোগের ক্ষেত্রেও নিয়মিত টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সাধারণত প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজের লক্ষ্য নেওয়া হয়। তবে এই হার সব রোগের জন্য একই নয়। রোগের সংক্রমণক্ষমতা, টিকার কার্যকারিতা এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুরক্ষার বণ্টনের ওপর প্রয়োজনীয় কভারেজ নির্ভর করে।

বাংলাদেশে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসার তথ্য সঠিক হলে, তা হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত কভারেজের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে শুধু জাতীয় পর্যায়ের গড় হার বাড়ালেই হবে না; যেসব এলাকা, জনগোষ্ঠী বা বসতিতে শিশুরা বেশি হারে টিকার বাইরে রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

ল্যায়ন দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ও অনুমোদিত জাতীয় টিকানীতির অভাব কর্মসূচি পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ২০১৩ সালে একটি খসড়া তৈরি হলেও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় টিকানীতি থাকলে টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণ, অর্থায়ন, জনবল ব্যবস্থাপনা, নতুন টিকা অন্তর্ভুক্তি এবং কর্মসূচির জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। নীতিগত সমন্বয় দুর্বল হলে মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু মূল্যায়নে কর্মসূচির সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত পদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শূন্য রয়েছে।

জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্র পরিচালনা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, টিকার পরবর্তী ডোজের জন্য পরিবারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং দুর্গম এলাকায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ ব্যাহত হতে পারে। ফলে যেসব শিশু একবার টিকা নিতে পারেনি, তাদের পুনরায় কর্মসূচির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন কর্মী নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।

টিকার কার্যকারিতা বজায় রাখতে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘কোল্ড চেইন’।

মূল্যায়নে মাঠপর্যায়ে টিকা সংরক্ষণ ও তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ নিয়ে সমস্যা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে টিটেনাস ও ডিপথেরিয়ার টিকা অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমে যাওয়ার ঝুঁকি এবং বিতরণের সময় সঠিক তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অনেক টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার বাইরে থাকলে কার্যকারিতা হারাতে পারে। আবার কিছু টিকা জমে গেলে সেগুলোর গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সংরক্ষণযন্ত্রের নিয়মিত পরীক্ষা, তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিকাদানের ঘাটতি কমাতে মূল্যায়ন দল কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক মাইক্রোপ্ল্যান তৈরি করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে কোন এলাকায় কত শিশু রয়েছে, কারা টিকা পেয়েছে এবং কারা বাদ পড়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ইপিআইয়ের শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। বাদ পড়া শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনতে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত টিকা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এ ধরনের বয়সসীমা সম্প্রসারণ বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট টিকার জাতীয় নির্দেশিকা ও অনুমোদিত টিকাদান সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় কৌশলপত্র হালনাগাদ এবং স্কুলে ভর্তির সময় শিশুদের টিকা কার্ড যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিশুদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করা এবং নির্ধারিত ডোজ বাদ পড়লে পরিবারকে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে উৎসাহিত করা সহজ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা তখনও মূল্যায়ন দলের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে পাননি। তবে টিকাদান কার্যক্রমের জনবল ঘাটতি পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া মানসম্মত টিকাদান কেন্দ্র গড়ে তোলা, উন্মুক্ত স্থানে অস্থায়ী কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ভ্যাকসিনের বাফার স্টক বা জরুরি মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে টিকার সরবরাহে বিঘ্ন কমানো এবং প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে পরিকল্পনাগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, জনবল নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকির ওপর। পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের শনাক্তকরণ ও টিকাদানের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা হলে কর্মসূচির জবাবদিহি বাড়তে পারে।

শিশুদের টিকাদান শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে হাম, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশিসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশে টিকাদানের আওতা কমে যাওয়ার তথ্য এবং হাম-রুবেলার টিকা থেকে বিপুলসংখ্যক শিশুর বাদ পড়ার বিষয়টি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জাতীয় টিকানীতি চূড়ান্ত করা, শূন্য পদ পূরণ, কোল্ড চেইন শক্তিশালী করা এবং এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

টিকা পাওয়া প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে সংক্রামক রোগের বিস্তার কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর

উ
প
রে