×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

ভারতের উত্তাল অবস্থার মধ্যেই নতুন করে উত্তাল পাকিস্তান 

২০২৬ অক্টোবর ১৫ ১৭:৪৯:৫৯
ভারতের উত্তাল অবস্থার মধ্যেই নতুন করে উত্তাল পাকিস্তান 

নিজস্ব প্রতিবেদক: পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারের সুপারিশে এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পিটিআই এ সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং একে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।

জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন কেন জারি করা হলো

পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখোয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাদেশিক সরকার যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি। এ অবস্থায় জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেছে সরকার।

এ পদক্ষেপের জন্য পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২৩২ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, ২৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রদেশের সরকার সংবিধান অনুসারে পরিচালিত হতে পারছে না বলে গভর্নর প্রতিবেদন দিলে কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডির হাতে নেওয়ার কথা জানানো হয়। প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি, মন্ত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক পদাধিকারীদের দায়িত্বও স্থগিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গভর্নরকে সহায়তা করতে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য এ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযোগ ও পিটিআইয়ের পাল্টা বক্তব্য

পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারারসহ কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী দাবি করেছেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

তবে পিটিআই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতাদের দাবি, প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্বেগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মতে, নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে স্থগিত করা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ওপর আঘাত।

পিটিআই নেতারা আরও বলেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রাদেশিক সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থ, সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হয়নি। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও বিরোধ তীব্র হয়েছে।

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চ

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে; তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কয়েকটি মামলায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের সমর্থকেরা অক্টোবরের শুরুতে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেন। ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল রাজধানীতে পৌঁছে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন এলাকায় পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীদের আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

লংমার্চকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা হলেও তা থেকে সমঝোতা আসেনি। এরপরই জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পিটিআই জানিয়েছে, সরকারের পদক্ষেপের পরও তাদের আন্দোলন বন্ধ হয়নি। দলটি আদালত ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করার কথা বলেছে।

ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার, সড়কে কন্টেইনার

লংমার্চ ও সম্ভাব্য বিক্ষোভ মোকাবিলায় ইসলামাবাদ এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বড় কন্টেইনার বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে বিক্ষোভকারীরা সহজে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এলাকায় প্রবেশ করতে না পারেন।

পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলন দমনে দলটির নেতা-কর্মীদের আটক করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারের বক্তব্য হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকানোই এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া গেছে।

আফগানিস্তান সীমান্তে সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ

খাইবার পাখতুনখোয়া আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠিন হতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, প্রাদেশিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে বিরোধী দলগুলোর একাংশের আশঙ্কা, জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জরুরি অবস্থার মেয়াদ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া

পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের ক্ষেত্রে আলাদা অনুমোদন এবং মেয়াদের বিধান রয়েছে। প্রাদেশিক পরিষদের অনুমোদন ছাড়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হয়। জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে যৌথ অধিবেশনের অনুমোদনও প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে, ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গভর্নর শাসন প্রথমে দুই মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে এবং সংসদের অনুমোদনে নির্দিষ্ট শর্তে তা বাড়ানো যায়; মোট মেয়াদ ছয় মাসের বেশি হতে পারে না। তবে জরুরি অবস্থার মেয়াদ ও গভর্নর শাসনের মেয়াদ এক নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনি পদক্ষেপের ওপর।

রাজনৈতিক সংকট কাটাতে সংলাপের গুরুত্ব

খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারির পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে বিরোধ নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে পিটিআই প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংলাপ, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের চলাচল, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজাই পাকিস্তানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে