×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের নতুন চাল 

২০২৬ অক্টোবর ১৫ ১১:৪৫:৩০
বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের নতুন চাল 

নিজস্ব প্রতিবেদক: চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ঘিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব ক্রমেই আলোচনায় আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি পরিবহন, সামুদ্রিক বাণিজ্য, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরও এ ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। এই নির্ভরতা কমাতে আঞ্চলিক সরাসরি সমুদ্রপথ চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

চট্টগ্রাম ও থাইল্যান্ডের রেংগুন বন্দরের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রপথ চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশের বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটটি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে রুটটির বর্তমান অগ্রগতি, কার্যক্রম শুরুর সময় এবং সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এই ধরনের সামুদ্রিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোরের (আইএনএসটিসি) লক্ষ্য হলো ভারত, ইরান, রাশিয়া এবং ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ গড়ে তোলা। এই করিডোরের মাধ্যমে সমুদ্র, রেল ও সড়কপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কোনো রুটের সঙ্গে আইএনএসটিসির সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও পরিবহন অবকাঠামোর তথ্য যাচাই করা জরুরি।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের গওদর বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরও আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বিভিন্ন দেশে বন্দর, সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতিও বিস্তৃত হতে পারে। তবে প্রতিটি প্রকল্পের অর্থায়ন, মালিকানা, পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে চুক্তির শর্ত আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য নতুন সমুদ্রপথ চালুর সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে রপ্তানি পণ্য দ্রুত পরিবহন, লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ। বিশেষ করে মধ্য এশিয়া ও তুরস্কের বাজারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিকল্প পরিবহন নেটওয়ার্ক কাজে আসতে পারে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে পেতে হলে শুধু সমুদ্রপথ চালু করলেই হবে না; বন্দরের সক্ষমতা, পণ্য খালাসের সময়, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং স্থল, নৌ ও রেলপথের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

প্রস্তাবিত রুটের ক্ষেত্রে পণ্য এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তরের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের ট্রান্সশিপমেন্টের কারণে অতিরিক্ত খরচ, বিলম্ব ও পণ্য ব্যবস্থাপনার জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে সরাসরি রুটের সুবিধা মূল্যায়নের সময় শুধু সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব নয়, বরং পুরো পরিবহনব্যবস্থার মোট ব্যয় ও সময় হিসাব করা জরুরি। পাশাপাশি বাণিজ্যের পরিমাণ, নিয়মিত জাহাজ চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট বন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক লাভ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা, ঋণ ও বিনিয়োগের শর্ত এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চীনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কার্যকর পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে