×
ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা দিল সোনালী ব্যাংক

২০২৬ অক্টোবর ১৪ ০৯:০০:৪৩
ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা দিল সোনালী ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ শতাংশ সুদে ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে তিন মাসের জন্য এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। এদিকে আমানত ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরুর পর প্রথম তিন দিনেই প্রায় সাড়ে ৭ হাজার আবেদন জমা পড়েছে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ অক্টোবর থেকে ১ লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে—এমন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরু করে ন্যাশনাল ব্যাংক। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে প্রতিটি শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন।

মেলিতা মেহজাবীন বলেন, ১ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো তাঁদের অর্থের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। তাঁর আশা, গ্রাহকেরা টাকা উত্তোলনের সুযোগ পেলে ব্যাংকটির প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। কারণ, গ্রাহকেরা দেখতে চান ব্যাংক তাঁদের আমানত ফেরত দিতে পারছে কি না।

আবেদনের সংখ্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। অনেক গ্রাহক আমানতের সুদ পাওয়ার পর তাঁদের অর্থ ব্যাংকটিতেই রেখে দেবেন বলে তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে আমানতের মেয়াদপূর্তির আগেই গ্রাহকেরা যেন টাকা তুলে না নেন, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ন্যাশনাল ব্যাংককে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় ব্যাংকটি কোনো সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দেবে বলে গভর্নর আশ্বাস দিয়েছেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অর্থ ফেরত দেবে। ফলে এ অর্থায়নে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই বলে তিনি দাবি করেন। এর আগে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

একসময় দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা বোর্ডে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা বোর্ডে আবারও পরিবর্তন আনা হয়। তবে আগের সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত সমস্যার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক সূচক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ধারাবাহিক লোকসানের পাশাপাশি আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে প্রতিষ্ঠানটিকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এর আগে ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।

সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের চারজন আমানতকারী তাঁদের জমা টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। শুনানি শেষে তাঁদের সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এ পরিস্থিতিতে গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক।

সাক্ষাৎকালে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

গভর্নর ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব আমানতকারী যাতে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন গভর্নর।

এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে সেই দায় মেটাতে হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত দায় তৈরি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পাওনার পরিমাণ ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অর্থের পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে দিয়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তাৎক্ষণিক অর্থসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। তবে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং ব্যাংকের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটানো কঠিন হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে