×
ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের দুর্বল নজরদারির ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা

২০২৬ অক্টোবর ১১ ১৮:৩২:২১
ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের দুর্বল নজরদারির ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে প্রতারণা ও অনিয়ম থেকে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমিতিগুলোর নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বনিয়ন্ত্রণের অর্থ শুধু ভালো চর্চায় উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং নীতিমালা লঙ্ঘন ও অসদাচরণের ঘটনায় সদস্যপদ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও এর অংশ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানও এ ক্ষেত্রে সমিতিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলেই স্বনিয়ন্ত্রণ কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস থাকলেও সংগঠনটি প্রায় নিষ্ক্রিয়। সম্পদ ব্যবস্থাপকদের বড় একটি অংশ এতে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। কারণ, সংগঠনটির কাঠামোয় প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য একটি করে ভোটের ব্যবস্থা থাকায় বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব তুলনামূলক বেশি। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের প্রাধান্য তৈরি হয় এবং তাদের অনিয়ম উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

এ পরিস্থিতিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন একটি সমিতি গঠনের উদ্যোগ নিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সমিতি গঠনের সুযোগ করে দিতে কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবে।

তবে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের অনেকে মনে করেন, প্রতারণার ঘটনা মূলত মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনায় বেশি ঘটেছে। এ ধরনের ফান্ডের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতোমধ্যে নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করেছে। বর্তমানে উন্মুক্ত বা ওপেন-এন্ড ফান্ডের আধিক্য বেশি। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) ভিত্তিতে যেকোনো সময় ইউনিট বিক্রি করে অর্থ তুলে নিতে পারেন, ফলে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তুলনামূলক কম বলে ফান্ড ব্যবস্থাপকদের দাবি।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ছিল ওপেন-এন্ড ফান্ডের অধীনে। এদিকে বিএসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান বিধিমালায় কাস্টডিয়ান বা সম্পদ সংরক্ষণকারীদের দায়িত্বও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

ব্রোকারদের সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। ডিবিএ থাকা সত্ত্বেও তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিহর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি করে ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি (ফিনরা)। ব্রোকারদের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও সংস্থাটির মূল লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সিকিউরিটিজ খাতে ন্যায়সংগত ও সৎ কার্যক্রম নিশ্চিত করা। প্রতারণা, অনৈতিক আচরণ কিংবা গ্রাহকের সম্পদের অপব্যবহারের মতো অভিযোগে ফিনরা বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ বাতিল করেছে। ২০২৩ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আগের শেয়ারসংক্রান্ত বিনিয়োগে পারিশ্রমিকের বিষয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা, অতিরিক্ত লেনদেন এবং প্রতিনিধিদের কার্যক্রম তদারকিতে ব্যর্থতার কারণে এসডব্লিউ ফাইন্যান্সিয়ালকে বহিষ্কার করে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দেশে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি প্রাথমিক পর্যায়ের নজরদারির দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিবিএ মূলত সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি লেনদেনের ক্ষেত্রে উচ্চতর ফ্রি-লিমিটের সুযোগ বাড়ানোর দাবির কথা উল্লেখ করেন।

তবে ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংগঠনটির নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্রোকারের লাইসেন্স স্থগিত হলে তার সদস্যপদও স্থগিত থাকে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি জটিল হতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় দেশে ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলও রয়েছে। ২০০০ সালের আগস্টে গঠিত এ তহবিল থেকে ব্রোকারের প্রতারণা বা অর্থ ও সিকিউরিটিজ আত্মসাতের শিকার বিনিয়োগকারীরা কিছু ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। তবে তহবিলের আকার ছোট হওয়ায় ক্ষতির পুরোটা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারদের প্রতি প্রান্তিকে ৫ হাজার টাকা করে তহবিলে জমা দিতে হয়। এ ছাড়া কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) রাখা আমানতের সুদ থেকে অর্জিত অর্থের ২৫ শতাংশও তহবিলে স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা এ তহবিল থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতিকে কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে