×
ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

দেশে ১৪ ধরনের মানসিক রোগ নিয়ে উদ্বেগ

২০২৬ অক্টোবর ১০ ১১:১৭:০৬
দেশে ১৪ ধরনের মানসিক রোগ নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি ও নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু সচেতনতার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগের কারণে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পায়নি। অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন।

মানসিক রোগের ১৪টি ধরন

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিভিন্ন ধরন উঠে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. বিষণ্ণতাজনিত রোগ: দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, আগ্রহ কমে যাওয়া ও দৈনন্দিন কাজে অনীহা।

২. উদ্বেগ ও ভীতিজনিত রোগ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভয় ও প্যানিক ডিসঅর্ডার।

৩. সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য সাইকোটিক রোগ: চিন্তা, অনুভূতি ও বাস্তবতা উপলব্ধিতে গুরুতর সমস্যা।

৪. বাইপোলার ডিসঅর্ডার: মেজাজ, শক্তি ও কর্মক্ষমতায় অস্বাভাবিক ওঠানামা।

৫. অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি): অনিচ্ছাকৃত চিন্তা এবং বারবার একই কাজ করার তাগিদ।

৬. মানসিক আঘাত ও অতিরিক্ত চাপজনিত রোগ: যেমন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)।

৭. স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা: যেমন অটিজম ও এডিএইচডি।

৮. ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস-সম্পর্কিত রোগ: ঘুম বা খাওয়ার স্বাভাবিক অভ্যাসে গুরুতর সমস্যা।

৯. মাদকদ্রব্য ব্যবহার ও আসক্তিজনিত সমস্যা: মাদক বা অন্যান্য আসক্তিকর উপাদানের ওপর নির্ভরশীলতা।

১০. ব্যক্তিত্বজনিত রোগ: আচরণ, আবেগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার ধরন।

১১. স্মৃতি ও চিন্তাশক্তির অবনতিসংশ্লিষ্ট রোগ: স্মৃতি, বিচারবোধ ও চিন্তাশক্তির অবনতি।

১২. বিচ্ছিন্নতাজনিত রোগ: স্মৃতি, পরিচয় বা উপলব্ধির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়া।

১৩. আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত সমস্যা: আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অসুবিধা।

১৪. গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যা: গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর দেখা দেওয়া বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক সমস্যার ধরন ও তীব্রতা ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে রোগ নির্ধারণ না করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসকের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি এবং সাইকোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ৭০০।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তরুণদের মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ

করোনাভাইরাস মহামারির পর তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বেকারত্ব, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং মাদকাসক্তির মতো বিষয় মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণায় ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ১৫০টি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ৯৮৪টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় শনাক্ত ঘটনাগুলোর ৬১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৩৯ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থীকে নিয়ে ছিল। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ঘটনাগুলোর ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া যায়।

তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা বিশ্লেষণ করে পাওয়া এই সংখ্যা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার পূর্ণাঙ্গ বা সরকারি মোট হিসাব নয়। গবেষণার তথ্য মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

মাদকাসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মাদক ব্যবহারের সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজে সঠিকভাবে বোঝা হয় না। কেউ কেউ চিকিৎসার পরিবর্তে শাস্তিমূলক আচরণের শিকার হন, ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে থেকে যান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তিকে কেবল অনৈতিক আচরণ হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামোগত ঘাটতি

দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদার তুলনায় বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল ও সেবার সুযোগ সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঢাকায় সরকার অনুমোদিত ১৫টি বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগজনিত সমস্যা মোকাবিলায় নিয়মিত যত্ন এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কুসংস্কার দূর করা জরুরি। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের আলোচনাতেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের কথা শোনা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সেবার উন্নয়নে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসক বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সহায়তা নেওয়া উচিত। পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতি, সামাজিক সহযোগিতা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে