×
ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক বাজারকে ‘সিলো’ থেকে বের করে সমন্বিত ব্যবস্থার তাগিদ তানভীর গনির

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ২১:০৯:০৬
আর্থিক বাজারকে ‘সিলো’ থেকে বের করে সমন্বিত ব্যবস্থার তাগিদ তানভীর গনির

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কার্যকর প্রয়োগ এবং পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ও কার্যকর আর্থিক বাজার গড়ে তোলা সম্ভব।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে আইসিএবি মিলনায়তনে দেশের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান—আইসিএবি, আইসিএমএবি, আইসিএসবি, আইআইএবি ও এসিসিএ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নিরীক্ষা, প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পেশাজীবী সংস্থাগুলোর ভূমিকা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তানভীর শাহরিয়ার গনি।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিএবির প্রেসিডেন্ট সাব্বীর আহমেদ এবং সমাপনী বক্তব্য দেন আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট কাউসার আলম।

এ ছাড়া প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিএমএবির সভাপতি আরিফ খান এফসিএমএ, এসিসিএর কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা খান, আইআইএবির প্রেসিডেন্ট এম. নুরুল আলম এবং আইসিএসবির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান।

সম্মেলনে আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান এফসিএ ‘বিল্ডিং ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স: আইসিএবির রোল ইন রিপোর্টিং, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ অর্থাৎ ‘বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আইসিএবির ভূমিকা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা বিনিয়োগকারীর আস্থার ভিত্তি

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন বিনিয়োগকারী সাধারণত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন আর্থিক অনুপাত, ব্যবসার গতিশীলতা, আঞ্চলিক তুলনা, মূল্যায়নসহ নানা বিষয় পর্যালোচনা করেন। এসব সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশই কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি থাকলে বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়বেন। আর বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো শেয়ারবাজার এবং দেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য যেন কোম্পানির বাস্তব পরিস্থিতির যথাযথ প্রতিফলন ঘটায়, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলেন, হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সত্যতা উপস্থাপনের একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড রয়েছে। সেই মানদণ্ডের মধ্যেই আর্থিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক পুঁজি অত্যন্ত গতিশীল। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করে নিজেদের অর্থ এক বাজার থেকে অন্য বাজারে স্থানান্তর করেন।

আস্থার পরিবেশ থাকলে বড় বিনিয়োগ সম্ভব

নিজের বিনিয়োগ অভিজ্ঞতার উদাহরণ তুলে ধরে তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, ভিয়েতনামে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেখানে তার কোনো বিনিয়োগ ছিল না। তবে ২০২২ সালে তিনি ভিয়েতনামের দুটি কোম্পানিতে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন।

তার মতে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং, অর্থায়ন ও পরিপালনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল বলেই এ ধরনের বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশেও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন তিনি। তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, দেশে আইসিএবি, আইসিএমএবি, এসিসিএ ও আইসিএসবির মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই শুধু প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো গড়ে তুললেই হবে না; এসব প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে হবে।

একই খাতে তুলনাযোগ্য মানদণ্ড জরুরি

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করাই শেষ কথা নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই খাতের পাঁচটি কোম্পানির আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করার সময় যেন একই ধরনের মানদণ্ডে তাদের মূল্যায়ন করা যায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, খাতভেদে হিসাবের পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তবে একই খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ ও তুলনার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তুলনাযোগ্য মানদণ্ড থাকা জরুরি।

পেশাগত সততাকে আর্থিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পেশাগত সততা মূলত নিজের ওপর আরোপিত একটি শৃঙ্খলা।’ তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি এবং শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

তিনি বলেন, আর্থিক বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে হবে। পেশাজীবী, কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা—প্রত্যেক পক্ষকেই নিজেদের অবস্থান থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব

ভবিষ্যতের শেয়ারবাজারকে আরও কার্যকর করতে কাজের মানোন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তানভীর শাহরিয়ার গনি।

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা ঝুঁকির ইঙ্গিত না থাকলেও এলোমেলোভাবে ফাইল নির্বাচন করে পর্যালোচনা করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঝুঁকি-পরিমাপকের ভিত্তিতে তদারকি করা উচিত। কোন বিষয় আগে পর্যালোচনা করা হবে, তা ঝুঁকির মাত্রা ও প্রাসঙ্গিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তানভীর শাহরিয়ার গনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে নিজ নিজ পৃথক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতির প্রতিটি অংশ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, একই প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেটি বিএসইসির নিয়ন্ত্রণের আওতাতেও আসে।

তাই অর্থনীতিকে আলাদা আলাদা ‘সিলো’ বা বিচ্ছিন্ন কাঠামোর মধ্যে রেখে পরিচালনা করা কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বিনিময় হার, করনীতি, ব্যাংকিং, বীমা, পুঁজিবাজার ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটি খাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অন্য খাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, ‘১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে আলাদা আলাদা সিলোর মধ্যে রেখে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’ অর্থনীতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য, নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব শেয়ারবাজারকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে মূলধনের যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা তৈরি হবে, তা পূরণে দেশের শেয়ারবাজারকে কার্যকর ভূমিকা পালনের উপযোগী করে তুলতে হবে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে