×
ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

উদ্যোক্তাদের শেয়ারবাজারভীতি কাটাতে হবে: মাসুদ খান

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ২০:৫৯:৪৬
উদ্যোক্তাদের শেয়ারবাজারভীতি কাটাতে হবে: মাসুদ খান

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অনেক উদ্যোক্তার মধ্যেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়ে এক ধরনের ভয় বা মানসিক বাধা রয়েছে। এই ‘গ্লাস সিলিং’ বা অদৃশ্য বাধা দূর করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ভবিষ্যতে সেখান থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে আইসিএবি মিলনায়তনে দেশের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী সংস্থা—আইসিএবি, আইসিএমএবি, আইসিএসবি, আইআইএবি ও এসিসিএ যৌথভাবে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নিরীক্ষা, প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পেশাজীবী সংস্থাগুলোর ভূমিকা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিএবির প্রেসিডেন্ট সাব্বীর আহমেদ এবং সমাপনী বক্তব্য দেন আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট কাউসার আলম।

এ ছাড়া সম্মেলনের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিএমএবির সভাপতি আরিফ খান এফসিএমএ, এসিসিএর কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা খান, আইআইএবির প্রেসিডেন্ট এম. নুরুল আলম এবং আইসিএসবির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান।

আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান এফসিএ ‘বিল্ডিং ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স: আইসিএবির রোল ইন রিপোর্টিং, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আইসিএবির ভূমিকা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আর্থিক প্রতিবেদনে শুধু তথ্য প্রকাশ নয়, সামঞ্জস্যও যাচাই জরুরি

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার সময় আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে কি না, শুধু সেটি যাচাই করলেই যথেষ্ট নয়। প্রতিবেদনে থাকা বিভিন্ন সংখ্যার মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং সেগুলো বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও বিশ্লেষণ করতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো কোম্পানির মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও একই সময়ে তার নগদ অর্থ কমে গেলে সেটি সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মূলধনের পরিবর্তন, নগদ প্রবাহসহ অন্যান্য আর্থিক তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আইপিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব সম্পন্ন হতে তিন মাসের বেশি সময় লাগার কোনো কারণ নেই। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বিএসইসির নথি যাচাইয়ের কাজের সঙ্গে নিরীক্ষকদের মাধ্যমে বর্ধিত নিরীক্ষা যুক্ত করা গেলে অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে মাসুদ খান বলেন, ইন্টারনাল অডিটকে প্রতিষ্ঠানের ‘থার্ড আই’ বা তৃতীয় চোখ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাবে।

বৈশ্বিক মানদণ্ডের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একজন বিনিয়োগকারী আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসার গতিশীলতা এবং কোম্পানির মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করেন। এসব প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি থাকলে বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু ওই বিনিয়োগকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পুঁজিবাজার এবং দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, শুধু বৈশ্বিক মানদণ্ড গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ ও কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

তানভীর শাহরিয়ার গনি আরও বলেন, পেশাগত সততা মূলত নিজের ওপর আরোপিত একটি শৃঙ্খলা। তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিএসইসির মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আলাদাভাবে কাজ না করে সমন্বিতভাবে এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিমাপক বা প্যারামিটারের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, কোনোভাবেই আশা হারানো উচিত নয়। আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আশা। ভারত একসময় পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও আজ বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পেরেছে। সুতরাং সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে বর্তমান অবস্থান থেকে বাংলাদেশকেও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিক্রি ও রপ্তানি বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠানে মার্জিন বাড়ছে না

আইসিএবির চেয়ারম্যান সাব্বীর আহমেদ বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বা টপলাইন এবং রপ্তানি আয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত হারে মুনাফার মার্জিন বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও সঠিক ধারণা না রেখেই বাইরের পক্ষের সঙ্গে দর-কষাকষি করে। ফলে উৎপাদন ব্যয় এবং প্রকৃত মুনাফার চিত্র স্পষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয় না।

তিনি আরও বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পরিধি যত বাড়ছে, ততই শক্তিশালী করপোরেট সচিবালয়, পরিপালন এবং সুশাসন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের টপলাইন ভালো হলেই যথেষ্ট নয়। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মুনাফার মার্জিন ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসন এবং পরিপালন—সব ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বাজারের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

আইসিএমএবির সভাপতি আরিফ খান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যতই অভিজ্ঞ হোক না কেন, বাজারের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বাজারে হাজার হাজার ও লাখো অংশগ্রহণকারী রয়েছেন। তাদের সম্মিলিত জ্ঞান অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার জ্ঞানের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই বাজারের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, কোনো অনিয়ম বা ভুল তথ্যের জন্য সব দায় শুধু নিরীক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। নিরীক্ষক সাধারণত নমুনাভিত্তিক পদ্ধতিতে হিসাব পরীক্ষা করেন। একটি কোম্পানির আর্থিক তথ্যের প্রাথমিক দায় উদ্যোক্তা বা প্রমোটারের। এরপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও)।

পারিবারিক ব্যবসা প্রসঙ্গে আরিফ খান বলেন, বড় পারিবারিক ব্যবসাগুলোতে দ্বিতীয় প্রজন্মে সম্পদ ও শেয়ার বণ্টনকে কেন্দ্র করে অনেক সময় বিরোধ দেখা দেয়। কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে মালিকানা বণ্টন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে