×
ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসঙ্গে দিল্লির ছক ভাঙছে ঢাকা-তেহরান-ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ ০৮:৩৫:১২
একসঙ্গে দিল্লির ছক ভাঙছে ঢাকা-তেহরান-ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর করমর্দনের একটি ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে—এমন নানা আলোচনা শুরু হয়। তবে ফ্যাক্টচেক করে দেখা গেছে, ভাইরাল ছবিটি বাস্তব কোনো বৈঠকের ছবি নয়; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, ভাইরাল ছবিতে তারেক রহমানকে যে পোশাকে দেখা যায়, একই পোশাকে তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকের সময়ের একটি বাস্তব ছবিতে দেখা যায়। নিউইয়র্কে ২৪ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান ও শেহবাজ শরিফের বৈঠকের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ছবিকে ভিত্তি করে ডিজিটালভাবে শেহবাজ শরিফের জায়গায় নেতানিয়াহুর ছবি বসিয়ে ভাইরাল ছবিটি তৈরি করা হয়েছে বলে ফ্যাক্টচেকে উঠে এসেছে।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্টও ছবিটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে শনাক্ত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমান ও নেতানিয়াহুর করমর্দনের দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি বাস্তব নয়।

অর্থাৎ ভাইরাল ছবিকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান ও নেতানিয়াহুর মধ্যে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বৈঠক হয়েছে—এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে শুধু ওই ছবির ভিত্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের দিকে কোনো নির্দিষ্ট পরিবর্তন এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পাশাপাশি পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও কৌশলগত যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা সম্পূর্ণ দিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারি বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তৃত। পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। একই সময়ে বাংলাদেশ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। ফলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একসঙ্গে যোগাযোগ রাখা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমাত্রিকতার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট ২০২৬ ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বাংলাদেশও এতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আগস্টে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, বাংলাদেশ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও বন্ধ হয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর নিয়ে দিল্লির কাছে তখনো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন কোনো তথ্য আসেনি। তিনি জানান, ভারত তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আলাদা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং পরে ব্রিকস-সংক্রান্ত একটি আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল।

এসব ঘটনাকে একসঙ্গে দেখলে বাংলাদেশের কূটনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্ভাব্য নতুন কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মানেই অন্য একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কমে যাচ্ছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এআই-নির্মিত ছবি এই ধরনের বিভ্রান্তি আরও বাড়াতে পারে। তারেক রহমান ও নেতানিয়াহুর কথিত বৈঠকের ভাইরাল ছবিটির ক্ষেত্রে যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি বাস্তব ছবি নয়।

তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা পোস্টের পরিবর্তে সরকারি বক্তব্য, কূটনৈতিক নথি এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ। ভাইরাল একটি এআই ছবিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া তথ্যগতভাবে যথেষ্ট নয়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে