×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ১১:৩১:০৭
অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর শেয়ালধরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর করার কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, ভুয়া রসিদ দেওয়াসহ ব্যাংক হিসাব থেকে গ্রাহকদের অজান্তে টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তরের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আউটলেটটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতের নামে নেওয়া এসব অর্থের অনেকগুলোর ব্যাংক রেকর্ডে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের।

উদং মধুপুর গ্রামের শোভা খাতুন জানান, একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে তিনি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। ভবিষ্যতে ছেলের পড়াশোনায় কাজে লাগানোর আশায় ওই অর্থ সঞ্চয়পত্রে জমা দেওয়ার জন্য এজেন্ট আউটলেটে দেন। এর বিপরীতে তাকে একটি রসিদ দেওয়া হয়। পরে মূল ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে ওই টাকা জমা হওয়ার কোনো তথ্য ব্যাংকের নথিতে নেই এবং তাকে দেওয়া রসিদটিও ভুয়া।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নারায়ণপুর গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী সুজন মিয়ার স্ত্রী শামছুন্নাহার। তার দাবি, স্বামীর পাঠানো অর্থ দিয়ে ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও ২৪ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে জমা দেওয়ার কথা বলে তিনি আউটলেটে দেন। পরে ওই লেনদেনের রসিদ ভুয়া বলে জানতে পারেন।

চরকাশিনগর গ্রামের আনসার সদস্য মো. সোহেল মিয়াও সঞ্চয়পত্র বা আমানতের নামে সাড়ে ৯ লাখ টাকা দেওয়ার পর তা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়াপ্রবাসী কালাম মিয়ার ব্যাংক হিসাব থেকে তার স্ত্রীর অজান্তে ১৭ লাখ টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তরের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও পরবর্তীতে ব্যাংকের নথিতে এসব লেনদেনের সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় বুধবার দুপুরে শেয়ালধরা বাজারে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর আলম।

লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আউটলেটটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পরও বিষয়টি গোপন রেখে ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগীরা জানান, এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন তারা। দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি করেছেন।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ বাজার শাখার অধীন ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটির স্বত্বাধিকারী ‘পড়শী সেবালয়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর মালিক মো. মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান। ২০২০ সালের জুনে আউটলেটটির কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ গ্রাহক ছিলেন।

অসংগতি ও অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ২১ জুন আউটলেটটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বন্ধের পরও ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে গোপনে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে চলতি বছরের ১৮ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ শাখার কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে সাইনবোর্ডটি অপসারণ করেন।

তবে আউটলেটটির স্বত্বাধিকারী মো. মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ইস্যু করার কোনো অনুমোদন তাদের ছিল না। সঞ্চয়পত্রের নামে কীভাবে কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন।

মিজান ঘটনার দায় আউটলেটের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম ওরফে সোহেলের ওপর দিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ব্যবস্থাপক সোহেল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে এবং মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, আউটলেটটি বন্ধ করার সময় সেখানে গ্রাহকদের আনুমানিক ১ কোটি ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আমানত ছিল।

তিনি বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে সঞ্চয়পত্র ইস্যু কিংবা এফডিআর করার কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন ছিল না। এসব কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ারও ওই আউটলেটের ছিল না।

ব্যাংক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের তদন্তে প্রাথমিক অনুসন্ধানে গ্রাহকদের প্রায় ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের সত্যতা পাওয়া গেছে। ব্যাংকের নথিবহির্ভূত এই অর্থ আত্মসাতের দায় সংশ্লিষ্ট এজেন্ট মালিককেই বহন করতে হবে বলে জানান তিনি।

অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে