×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনিয়ম-দুর্বল ব্যবস্থাপনায় বিপাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ০৮:২৮:৫৫
অনিয়ম-দুর্বল ব্যবস্থাপনায় বিপাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার কারণে এ খাতে চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠানে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে দেরি হওয়ায় তারল্য সংকটও প্রকট হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের এনবিএফআইগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওভারডিউ বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ এখন আদায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

একই সময়ে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। চার বছর আগের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ প্রান্তিকে এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। ফলে কয়েক বছরের ব্যবধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণমানের অবনতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন ও ঋণ বিতরণে নানা সমস্যার অভিযোগ রয়েছে। পরিচালকদের প্রভাব, নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ, দুর্বল ঋণ যাচাই এবং সময়মতো ঋণ আদায় না হওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পোর্টফোলিওতে চাপ তৈরি হয়েছে।

ঋণ আদায় কমে গেলে একদিকে প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যায়, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন বাড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, মূলধন ও তারল্য—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এনবিএফআই খাতের অনিয়মের আলোচনায় সাবেক ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নামও উঠে এসেছে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকটে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করায় প্রতিষ্ঠানের তারল্য পরিস্থিতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

করোনাকালেও ঋণ আদায়ের গতি কমে যাওয়ায় এ খাতের সংকট আরও গভীর হয়। পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সমস্যার কারণে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।

এনবিএফআইগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আয় ও মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি আমানতকারীরা অর্থ ফেরত চাইলে তারল্য ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে ওঠে।

ফলে নতুন করে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েসের মতে, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা চাপে রয়েছেন এবং এর প্রভাব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর পড়ছে। খেলাপি ঋণ কমাতে সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। তবে নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে এমন সুবিধা খেলাপিদের দেওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে ব্যাংকখাত বিশ্লেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, নীতিগত কিছু সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে সাময়িক স্বস্তি দেখা গেলেও আর্থিক খাতের মৌলিক দুর্বলতা কাটেনি। তার মতে, কঠোর তদারকি, সুশাসন এবং ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আবারও বাড়তে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা বা নতুন অর্থের জোগান দিয়ে এনবিএফআই খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা কঠিন। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, নিয়মিত ঋণ আদায়, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন বা একীভূত করার উদ্যোগও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ঋণ আদায়ের হার বাড়ানো এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন শক্তিশালী করাই এ সংকট মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে