×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর ২১ মিনিটের ভাষণে উঠে এলো যেসব বিষয়

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ০৯:৪১:৪০
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর ২১ মিনিটের ভাষণে উঠে এলো যেসব বিষয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলায় দেওয়া প্রায় ২১ মিনিটের ভাষণে তিনি বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নিরস্ত্রীকরণ, প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা। বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা সংঘাত মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে।

ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন

ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অবিচল রয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারে

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াকেই তিনি সংকটের সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। এ জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বান জানান।

তিনি জানান, পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্লিন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরার ঝুঁকি মোকাবিলায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের জন্য ৩-আর কৌশল

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ‘৩-আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন বা পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে দেশের জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

নারী ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব কর্মসূচিকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে বিশ্ব প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।

তিনি বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

অভিবাসন ও প্রবাসীদের অধিকার

নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষা ও খেলাধুলায় গুরুত্ব

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা কার্যক্রমে স্পোর্টসকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান।

বিনিয়োগ ও তরুণদের সুযোগ

বাংলাদেশকে তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগের কথা বলেন। বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে চায় যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং শিশুরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। এর মাধ্যমে তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিলেন। এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।

ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে জনগণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবে। তিনি জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে