×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুরআনের পাতা নষ্ট হয়ে গেছে? ফেলে দেবেন নাকি দাফন করবেন

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৭:৫৬:৫২
কুরআনের পাতা নষ্ট হয়ে গেছে? ফেলে দেবেন নাকি দাফন করবেন

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুরআন মাজিদের কোনো পাতা বা অংশ উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি কোনো অশুভ ইঙ্গিত, দুর্ভাগ্যের লক্ষণ কিংবা সামনে কোনো বিপদ আসার পূর্বাভাস? ইসলামী দৃষ্টিতে এর সঙ্গে অমঙ্গল বা অশুভ কোনো ইঙ্গিতের সম্পর্ক নেই। এটি মূলত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা।

উইপোকা সাধারণত কাগজ, কাঠসহ সেলুলোজজাতীয় বিভিন্ন পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কোনো মুসহাফ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করলে তাতে উইপোকা ধরতে পারে এবং পাতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমন ঘটনাকে নিজের জন্য অমঙ্গল বা আল্লাহর গজবের নিদর্শন মনে করার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।

ইসলামে কুসংস্কারবশত কোনো ঘটনা, বস্তু বা পরিস্থিতিকে অশুভ লক্ষণ মনে করাকে ‘তিয়ারাহ’ বলা হয়, যা নিষিদ্ধ। তাই মুসহাফের কোনো অংশ উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেখে আতঙ্কিত হওয়া, ভবিষ্যতে বিপদ আসবে বলে আশঙ্কা করা কিংবা এটিকে অমঙ্গলের পূর্বাভাস মনে করা সঠিক নয়।

তবে আল্লাহর কালাম হওয়ায় কুরআন মাজিদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও যত্ন প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। অসতর্কতার কারণে যদি দীর্ঘদিন মুসহাফ অবহেলায় পড়ে থাকার ফলে উইপোকা ধরে যায়, তাহলে নিজের ভুলের জন্য তাওবা ও ইস্তিগফার করা এবং ভবিষ্যতে কুরআন মাজিদ আরও যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা উচিত।

কুরআনে উইপোকার ঘটনা

পবিত্র কুরআনে হজরত সুলাইমান (আ.)-এর লাঠি উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَىٰ مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ»

অর্থ: “অতঃপর যখন আমি তার (সুলাইমানের) মৃত্যু নির্ধারণ করলাম, তখন তার মৃত্যুর খবর জিনদের কাছে শুধু মাটির পোকাটিই প্রকাশ করল, যা তার লাঠি খেয়ে ফেলছিল...” —সূরা সাবা: ১৪।

তাফসিরকারীদের ব্যাখ্যায় আয়াতের ‘দাব্বাতুল আরদ’ (دَابَّةُ الْأَرْضِ) বলতে উইপোকাকে বোঝানো হয়েছে। বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী, হজরত সুলাইমান (আ.) মৃত্যুর পরও লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে উইপোকা তাঁর লাঠির অংশ খেয়ে ফেললে তাঁর দেহ মাটিতে পড়ে যায়। তখন জিনেরা তাঁর ইন্তেকালের বিষয়টি জানতে পারে।

এ ঘটনার অন্যতম শিক্ষা হলো, জিনেরা গায়েবের জ্ঞান রাখে না। তারা যদি অদৃশ্যের সব খবর জানত, তাহলে সুলাইমান (আ.)-এর ইন্তেকালের বিষয়টি এতদিন তাদের অজানা থাকত না।

অতএব, কুরআনে উইপোকার ঘটনা উল্লেখ থাকলেও কোনো মুসহাফ উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে অশুভ লক্ষণ বা ভবিষ্যৎ বিপদের কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না।

উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসহাফের কী করবেন?

কোনো মুসহাফ উইপোকায় আক্রান্ত হওয়ার পরও যদি তার পাতা ও লেখা পাঠযোগ্য থাকে এবং তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করে তিলাওয়াত করা যাবে।

তবে কোনো মুসহাফের পাতা এতটাই জীর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে যে তা আর পড়া বা ব্যবহার করা সম্ভব নয়, তখন কুরআনের মর্যাদা রক্ষার জন্য সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেমগণ জীর্ণ মুসহাফের পাতা দাফন করা অথবা পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার উদ্দেশ্যে পুড়িয়ে ফেলার কথা উল্লেখ করেছেন।

একটি পদ্ধতি হলো, জীর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় কুরআনের পাতা এমন কোনো পবিত্র ও নির্জন স্থানে দাফন করা, যেখানে মানুষের নিয়মিত যাতায়াত নেই এবং সেগুলো পদদলিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে না।

অন্যদিকে, কুরআনের সম্মান রক্ষার জন্য জীর্ণ পাতাগুলো পুড়িয়ে ফেলার কথাও আলেমরা বৈধ বলেছেন। সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসহাফের কপিগুলো একত্রিত ও মানসম্মত করার সময় হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নির্দেশে অবশিষ্ট কিছু কপি অপসারণের জন্য পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও ইসলামী ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

শায়খ ইবনে বাযের ফতোয়া

পড়ার অযোগ্য, ছেঁড়াফাটা ও জীর্ণ কুরআন মাজিদের ব্যাপারে সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবনে বায (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জীর্ণ মুসহাফ দাফন অথবা পুড়িয়ে ফেলার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন—«نَعَمْ، السُّنَّةُ إِحْرَاقُهَا، أَوْ دَفْنُهَا فِي أَرْضٍ طَيِّبَةٍ»

অর্থ: “হ্যাঁ, সুন্নাহ হলো সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা অথবা পবিত্র কোনো মাটিতে দাফন করা।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, যেসব কুরআনের পাতা জীর্ণ হয়ে গেছে, আর ব্যবহার বা তিলাওয়াতের উপযোগী নেই, অথবা পুরোনো মুসহাফ থেকে আর উপকার নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না—সেগুলো পবিত্র স্থানে দাফন করা অথবা পুড়িয়ে ফেলা যেতে পারে। —ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর



রে