×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীন-ভারত-আমেরিকার খেলায় আসল চাল বাংলাদেশের হাতে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৫:০৩:০২
চীন-ভারত-আমেরিকার খেলায় আসল চাল বাংলাদেশের হাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির একদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই অবস্থানের কারণে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব নিয়ে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি দেশভিত্তিক কৌশলগত নথিতেও বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে কৌশলগতভাবে অবস্থিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছে।

বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে দেশটির ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।

তবে বাংলাদেশের গুরুত্বকে শুধু বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দেশের নিজস্ব বাণিজ্য, শিল্প, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রয়োজনও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ করে আসছে। বাংলাদেশ ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বড় বিষয় হলো বাণিজ্য ও অবকাঠামো। একই সঙ্গে ঢাকা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা করেছে।

বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মূল ভূখণ্ডের মধ্যে যোগাযোগের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে।

২০২৬ সালেও দুই দেশ সীমান্তে সমন্বিত টহল ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক নয়, সীমান্ত ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের জন্য বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগের গুরুত্বের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঢাকার নীতিগত অবস্থান নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতেও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি Reuters-ও প্রতিবেদন করেছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি কৌশলগত বিবেচনাও রয়েছে।

চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সামুদ্রিক পথে হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ কারণে চীনের জন্য বিকল্প ও নিরাপদ সরবরাহপথের গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে চীন বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছে। কোনো বন্দর বা অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং সম্ভাব্য কৌশলগত প্রভাব আলাদা বিষয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের চুক্তি, মালিকানা, পরিচালনা কাঠামো ও বাস্তব ব্যবহার বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য কিছু অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অংশীদারত্ব থেকে বাংলাদেশ সুবিধা নিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সরকারি ব্যাখ্যাতেও সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যেমন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের জন্য নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনও বাড়ায়। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক, সামরিক বা অবকাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ ছাড়া বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত, প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা কাঠামোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীন সম্প্রতি কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগস্ট ২০২৬-এ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘চীন-ভারত-আমেরিকার খেলায় সব চাল বাংলাদেশের হাতে’—এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য, প্রতিষ্ঠিত কোনো তথ্য নয়। বাস্তবে তিন দেশেরই নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে এবং বাংলাদেশেরও রয়েছে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ।

তাই বাংলাদেশের জন্য মূল বিষয় হতে পারে—বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার স্বার্থে কাজে লাগানো যায় এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা যায়।

সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাস্তব। তবে এটিকে শুধু চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার ‘মাঠ’ হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়। বরং বহুমুখী অংশীদারত্ব, স্বচ্ছ চুক্তি এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে