×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের বড় পরিকল্পনা! 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৪:৪৮:২৯
বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের বড় পরিকল্পনা! 

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের উপকূল এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দেশটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ঘিরে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের এই বৈশ্বিক অবকাঠামো ও বাণিজ্য উদ্যোগের অন্যতম ধারণা হলো স্থল ও সমুদ্রপথে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন বাজারকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা। এর সামুদ্রিক অংশকে সাধারণভাবে ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ বলা হয়।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দর, বঙ্গোপসাগরের অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগের সম্ভাবনা দেশটিকে এই বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বন্দর ও অবকাঠামো খাতে চীনের অংশগ্রহণের পেছনে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক—দুই ধরনের বিবেচনাই রয়েছে। তবে চীনের বিনিয়োগকে সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখার মতো প্রমাণও সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।

চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বঙ্গোপসাগর এই বৃহত্তর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বন্দরগুলোর উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সড়ক-রেল যোগাযোগ বাড়লে দেশের আমদানি-রপ্তানি যেমন সহজ হতে পারে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র। একই সময়ে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবকাঠামোও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে মাতারবাড়ি প্রকল্পটি চীনা প্রকল্প নয়; এটি জাপানের সহায়তায় উন্নয়ন করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোয় একাধিক দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে।

বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব। ২০২৬ সালের জুনে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবটি এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সম্ভাব্য করিডোরের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। চীনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, করিডোরটি ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকতে পারে।

এ কারণে ‘চীন ইতোমধ্যে ইউনান থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেল-সড়ক করিডোর নির্মাণ করছে’—এমন বক্তব্যকে বর্তমান বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এটি এখনো প্রস্তাব ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

২০২৬ সালে চীন চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি মংলা বন্দরকে আরও দক্ষ ও সেবামুখী করার বিষয়েও চীনের আগ্রহের কথা বাংলাদেশ জানিয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগকে শুধু চীনের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীন ছাড়াও জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে ঢাকা একই সঙ্গে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বাংলাদেশের গুরুত্বকে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখে না। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও সমুদ্রবন্দর ঘিরে তাই বড় শক্তিগুলোর আগ্রহও বাড়ছে।

গবেষণায় চীন-ভারত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানকে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

চীনের বন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌ-সক্ষমতা ও সামুদ্রিক উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তবে কোনো বাণিজ্যিক বন্দর বা অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ মানেই সেটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা, চুক্তির শর্ত এবং বাস্তব ব্যবহারের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনা বন্দর-সম্পৃক্ততার ওপর করা একটি গবেষণাতেও চীনের অংশগ্রহণকে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক—দুই দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সরাসরি সার্বভৌমত্ব বা ‘ডেট ট্র্যাপ’-সংক্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন-বাংলাদেশ যোগাযোগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরিবহন ব্যয় কমানো, নতুন বাজারে প্রবেশ, বন্দর সক্ষমতা বাড়ানো, শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক করিডোর ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো একটি পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। একই সঙ্গে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ, ব্যয়, বাণিজ্যিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী অংশীদারত্ব বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে ঢাকা নিজের কৌশলগত পরিসর ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অবস্থান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় যোগাযোগ কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এটি নিয়ে যথেষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ রয়েছে। তবে ‘চীন বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাকড়সার জালের মতো নেটওয়ার্ক তৈরি করছে’ বা ‘বাণিজ্যিক করিডোরের আড়ালে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে’—এ ধরনের বক্তব্যকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বাস্তব চিত্র হলো, বাংলাদেশ একদিকে চীনের বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ বিবেচনা করছে, অন্যদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-জাপানসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে