×
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এবার রিটেইল পোর্টফোলিও বিক্রি করবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১৪:০১:২৯
এবার রিটেইল পোর্টফোলিও বিক্রি করবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ব্যাংকটির রিটেইল ব্যাংকিং পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংক এই ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগকে বাংলাদেশের বাজার থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিশ্বজুড়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে রিটেইল ব্যাংকিং সীমিত করে তুলনামূলক বেশি মুনাফার করপোরেট, প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্পদশালী গ্রাহকদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কৌশলের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে ব্যাংকটি মৌখিকভাবে রিটেইল ব্যাংকিং পোর্টফোলিও বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য লেনদেনে বাইরের পরামর্শকের মাধ্যমে পোর্টফোলিওর মূল্যায়ন করার বিষয়টিও রয়েছে।

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসাটি বাজারে প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং এটি বিডিং বা দরপত্র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তবে লেনদেনের সুনির্দিষ্ট কাঠামো, সময়সীমা ও পরিধি এখনো সম্ভাব্য ক্রেতাদের জানানো হয়নি।

ব্যাংকটি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে প্রক্রিয়া শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আগ্রহী ব্যাংকগুলোর জন্য এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়নি।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির রিটেইল এবং কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই) পোর্টফোলিওর আকার ছিল ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির মোট ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার পোর্টফোলিওর প্রায় ২৮ শতাংশ।

এ ছাড়া ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বা ৮ হাজার কোটি টাকা ছিল রিটেইল আমানত।

রিটেইল ব্যাংকিং বলতে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকের দৈনন্দিন সেবাকে বোঝায়। এর মধ্যে সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, শাখাভিত্তিক সেবা, এটিএম, মোবাইল অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই ব্যবসা অন্য কোনো ব্যাংকের কাছে গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক, আমানত, ঋণসম্পর্ক, কর্মী ও অবকাঠামোর বিষয়গুলোও লেনদেনের অংশ হতে পারে। তবে সম্ভাব্য প্যাকেজের সঠিক কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার প্রতি সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ-মূল্যের গ্রাহকভিত্তির কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট এক ব্যাংকার।

তার মতে, ব্যাংকটির সম্পদশালী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গ্রাহকের অনুপাত তুলনামূলক বেশি এবং এসব গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে গড় ব্যালেন্সও বড়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত একটি উল্লেখযোগ্য এমপ্লয়ি-ব্যাংকিং ব্যবসাও রয়েছে।

তবে পোর্টফোলিও কোনো ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর হলেও সব গ্রাহক নতুন ব্যাংকে থেকে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। গ্রাহকদের নিজেদের ব্যাংকিং সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি ব্যাংক এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্ভাব্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে দরদাতাদের চূড়ান্ত তালিকা এখনো প্রকাশিত হয়নি এবং আনুষ্ঠানিক দরপত্র প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।সম্ভাব্য ক্রেতাদের পোর্টফোলিওর মূল্য নির্ধারণের জন্য পরামর্শক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তকে শুধু স্থানীয় পরিস্থিতির ফল হিসেবে দেখার চেয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আন্তর্জাতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে বা সীমিত করছে এবং একই সঙ্গে করপোরেট ব্যাংকিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মূলধনের ব্যয় বৃদ্ধি, বিদেশি বাজারে রিটেইল ব্যাংকিং পরিচালনার খরচ এবং কমপ্লায়েন্স ও অর্থপাচারবিরোধী বাধ্যবাধকতার ব্যয় বৃদ্ধিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতেও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম ছোট করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দেশটিতে ব্যাংকটির পোর্টফোলিওর একটি অংশ ফেডারেল ব্যাংকের কাছে বিক্রির চুক্তি হয়েছে এবং তা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে এর আগে ব্যাংক একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের ঘটনা ঘটলেও কোনো বিদেশি ব্যাংকের আলাদাভাবে রিটেইল ব্যাংকিং গ্রাহক পোর্টফোলিও বিক্রির এমন নজির সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারের জানা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে পুরো ব্যাংক বিক্রি বা একীভূত না করে একটি বিদেশি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার একটি অংশ আলাদাভাবে হস্তান্তরের উদ্যোগ বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বিরল লেনদেন হতে পারে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশি ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

তবে কৃষি ঋণ ও সিএমএসএমই খাতসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোকেও এসব নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন।

রিটেইল ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শাখা ও এটিএমের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে তাদের ১৮টি শাখা এবং ৭০টি সেলফ-সার্ভিস টার্মিনাল রয়েছে। পাঁচ বছর আগে শাখা ছিল প্রায় ২৪টি এবং এটিএম বুথ ছিল প্রায় ৮৩ থেকে ৯৬টি।

এ ছাড়া কয়েক বছর আগে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জমা রাখার শর্ত চালু করা হয়। সম্প্রতি এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সুবিধা বন্ধ করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে