×
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর নেপথ্য ৫ কারণ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১২:৪৬:৫৩
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর নেপথ্য ৫ কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। সম্প্রতি দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করলেও বাংলাদেশে একসঙ্গে এতটা দাম বাড়ানোর কারণ কী?

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় বাড়লেও জনস্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশে সে অনুযায়ী জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়নি। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে।

ফলে নতুন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদরকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। গত কয়েক মাসের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ও পরিবহন ব্যয় এবং বিপিসির পুঞ্জীভূত লোকসান—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতার পেছনে একাধিক ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। এতে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ ও সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিকল্প পরিবহনপথের ওপরও চাপ বেড়েছে। ফলে জ্বালানি পরিবহনে সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একই সময়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও জাহাজের জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে এসব ব্যয়ের প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে।

সরকারের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে লোকসানের চাপ কিছুটা কমাতেই নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। একইভাবে পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের হিসাবে ডিজেল বিক্রিতে বিপিসির প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল। এতে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা দাঁড়ায়।

এই হিসাব অনুযায়ী, দাম অপরিবর্তিত থাকলে বছরে ডিজেল খাতেই বিপিসির লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। একই সময়ে কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়। পরে জুন মাসে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত দাম অপরিবর্তিত ছিল।

জ্বালানি বিভাগের দেওয়া তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতের কলকাতায় প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা।

এ ছাড়া থাইল্যান্ডে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম দামে জ্বালানি বিক্রি হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এলএনজি বাজারেও পড়ছে। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়, বিপিসির লোকসান এবং দেশের বাজারে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি জ্বালানি পাচার ঠেকানোর বিষয়টিও দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে বাংলাদেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথে ক্ষয়ক্ষতির খবর থাকলেও প্রত্যাশার তুলনায় সরবরাহ পরিস্থিতি শক্তিশালী থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে।

সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়ায়।

এ কারণে দেশে দাম বাড়ানোর দিন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের ব্যাখ্যা হলো, দেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর নয়; বরং কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং বিপিসির লোকসান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাত বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার শোধনাগারে হামলা এবং ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনও ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির বাজারকে প্রভাবিত করছে।

ফলে বাংলাদেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে শুধু অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য নয়, আমদানি ব্যয়, ফ্রেইট চার্জ, বিনিময় হার, বিপিসির আর্থিক অবস্থাসহ একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে