×
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডিসেম্বর ঘিরে হাসিনার মাস্টারপ্ল্যান

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১২:২৩:১৮
ডিসেম্বর ঘিরে হাসিনার মাস্টারপ্ল্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণার পাশাপাশি রাজধানীতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি, ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।

জুলাই মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পর ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়। তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান এবং দেশে ফিরে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা কী হতে পারে—এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

শেখ হাসিনার বক্তব্যে ব্যক্তিগতভাবে দেশে ফেরার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়টিও উঠে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলটির কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।

দেশের বাইরে অবস্থান করেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম ধরে রাখতে দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসন নিয়ে অনলাইন বৈঠকও হয়েছে।

তবে এসব কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে দেশের আইনগত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপর।

এরই মধ্যে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর মালিবাগ, মহাখালী, আগারগাঁও ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে একাধিক বিস্ফোরণে একজন রিকশাচালক আহত হন।

সেদিন মালিবাগ রেলগেটের কাছে দুটি বিস্ফোরণ এবং মহাখালী এলাকায় আরেকটি বিস্ফোরণের কথা পুলিশ জানিয়েছে। আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বেতার ভবনের সামনেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। পরে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে।

এরপর মগবাজার, বাবুবাজার ও রামপুরা এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনার সবগুলোতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি; তবে যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় একজন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

২০ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রাজধানীর হাইকোর্টের সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, দুপুরের দিকে হাইকোর্টের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে বিস্ফোরণটি ঘটে। একই দিনে শিল্পকলা একাডেমির সামনেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

এর আগের রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মিরপুর ও মধ্যবাড্ডায় বাসে আগুন এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে পুলিশের জব্দ করা একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনের একটি প্ল্যাটফর্মেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

এসব ঘটনার পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট, তল্লাশি ও পুলিশি টহল বাড়ানো হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একটি ইউনিটের একজন নেতা রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথাও পুলিশ জানিয়েছে।

পরে ওই চারজনকে আদালতে হাজির করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে বলে বাসস জানিয়েছে।

তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তাদের সরাসরি সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের আরেকটি আলোচ্য বিষয় হলো রাজনৈতিক কর্মসূচির ধরন। বড় আকারের প্রকাশ্য সমাবেশের পরিবর্তে ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল, অনলাইন প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

এ ধরনের কর্মসূচি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক যোগাযোগের একটি ধরন হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে এসব কর্মসূচির সঙ্গে সহিংসতার ঘটনা যুক্ত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তার প্রভাব পড়ে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কোনো বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ বা সহিংস ঘটনার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সম্পৃক্ততা কেবল অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। পুলিশের তদন্ত, আদালতের নথি এবং যাচাই করা প্রমাণই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরের ফেরার পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি—দুই ঘটনাই একই সময়ে আলোচনায় আসায় ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ আরও বেড়েছে।

শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান। ফলে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনগত পরিস্থিতিও সরাসরি যুক্ত।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণ করতে চান। একই প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবং আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা ওই বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

ফলে ডিসেম্বর এলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—শেখ হাসিনা আদৌ দেশে ফিরছেন কি না, ফিরলে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থাকা বিধিনিষেধের অবস্থান কী থাকে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার বিষয়টিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও, তাঁর ঘোষিত বক্তব্য থেকে নিশ্চিতভাবে কোনো গোপন পরিকল্পনার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না।

প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পরিকল্পনা হলো ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া।অন্যদিকে রাজধানীতে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেএইচ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে