×
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্রামীণফোন-বাংলালিংকসহ বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আলোচনা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১২:১০:১৭
গ্রামীণফোন-বাংলালিংকসহ বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সঙ্গে চলমান রাজস্ব বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করে আটকে থাকা অর্থ আদায়ে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা এডিআর ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

গত দুই মাসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ (বিপিসি) কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতে বিচারাধীন রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলাগুলো এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ও উপায় নিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। তাঁর মতে, চলতি অর্থবছরের বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বকেয়া পাওনা এবং আইনি জটিলতায় আটকে থাকা রাজস্ব উদ্ধারের বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও জানিয়েছেন, সরকার দীর্ঘদিনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চায়। কোনো পক্ষ এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ সমাধানে আগ্রহী হলে সরকার তা বিবেচনা করবে বলে তিনি জানান।

এনবিআর কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আপিল ট্রাইব্যুনাল ও আদালতে বিচারাধীন ৩০ হাজারের বেশি মামলায় প্রায় ৯০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রয়েছে।

এর মধ্যে আয়কর-সংক্রান্ত মামলায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, কাস্টমস বা শুল্ক বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলায় ৪৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা জড়িত। এসবের কিছু বিরোধ এক দশকের বেশি সময় ধরে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হওয়ায় রাজস্ব বাড়ানোর চাপও বেড়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার আয়কর-সংক্রান্ত বিরোধ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। বিপিসির ক্ষেত্রেও প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে রাজস্ব বিরোধ আদালতে বিচারাধীন।

এ ছাড়া রবি আজিয়াটার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট-সংক্রান্ত বিরোধও আদালতে রয়েছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানায় এবং এর আগে এনবিআরের কাছে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়গুলো সমাধানের অনুরোধও করা হয়েছিল।

বাংলালিংকের একটি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি রাজস্ব বিরোধ নিয়েও সেখানে আলোচনা হয়েছে।

গ্রামীণফোনও জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে এনবিআরের বিরোধের বিষয়গুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। তবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ হিসেবে বিধিবদ্ধ এডিআর প্রক্রিয়া বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এনবিআর কর্মকর্তাদের হিসাবে, গ্রামীণফোনের সঙ্গে রাজস্ব বিরোধের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।

আমদানি-রপ্তানি, স্থানীয় বিক্রি কিংবা করদাতার রিটার্ন যাচাইয়ের সময় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অডিট বা নথিপত্র যাচাই করে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর বা রাজস্ব দাবি করতে পারে।

কোনো কোম্পানি বা করদাতা সেই দাবির সঙ্গে একমত না হলে আপিলের মাধ্যমে সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে, কোনো আমদানিকারক একটি পণ্য নির্দিষ্ট এইচএস কোডে ঘোষণা করলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে সেটি বেশি শুল্কযুক্ত অন্য একটি কোডে পড়বে, তাহলে অতিরিক্ত শুল্ক দাবি করা হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আপিল ট্রাইব্যুনাল থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারে।

রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে এনবিআর এডিআর ব্যবস্থা চালু করে। এ ব্যবস্থায় এনবিআরের বাইরের বিশেষজ্ঞরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তবে সমঝোতার জন্য এনবিআর ও করদাতা—দুই পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের ছাড় দিতে অনীহা, সম্ভাব্য আইনি বা বিভাগীয় জটিলতার আশঙ্কা এবং কিছু বিরোধের আইনগত প্রকৃতির কারণে এডিআর ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কোনো বিরোধে আইনের ব্যাখ্যা বা আমদানি পণ্যের সঠিক এইচএস কোড নির্ধারণের মতো বিষয় জড়িত থাকলে এডিআরের পরিধি সীমিত হয়ে যায়।

এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খুব কম ভ্যাট মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, এডিআরকে কার্যকর করতে হলে এর সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করতে হবে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য ও সাবেক এডিআর মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ মো. আমিনুল করিমও মনে করেন, এডিআরের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যে কর্মকর্তা প্রথমে করের দাবি নির্ধারণ করেন, অনেক সময় তাকেই এডিআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়। ফলে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সমঝোতা করার ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি হতে পারে।

২০২৩ সালে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট-ভ্যাটের মধ্যে বিরোধ এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছিল। ওই সমঝোতার মাধ্যমে সরকার প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর প্রায় ১৫২ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ওই সমঝোতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনবিআরের তৎকালীন বৃহৎ করদাতা ইউনিটের কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়েন। এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার পর কর্মকর্তাদের মধ্যে এডিআরের মাধ্যমে রাজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তিতে ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা বেড়েছে।

এ অবস্থায় সরকার এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজস্ব বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এডিআরকে আবারও সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি, আইনি কাঠামো এবং এডিআর ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ওপর।

কেএইচ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে