×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাগজে জন্ম, ৪৫ দিনেই মৃত্যু! ৭৪ শিশুকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর কাণ্ড

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১১:২০:২৭
কাগজে জন্ম, ৪৫ দিনেই মৃত্যু! ৭৪ শিশুকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর কাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক : জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে ৭৪টি অস্তিত্বহীন শিশুর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করার অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুরের এক ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ওই কর্মকর্তার নিবন্ধন সহকারীর ক্ষমতা প্রত্যাহারসহ তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম আবুল বাছের। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিবন্ধন সহকারী)। বর্তমানে তিনি একই উপজেলার টুমচর ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত রয়েছেন।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থা—বিডিআরআইএস (BDRIS)-এ ৭৪টি অস্তিত্বহীন শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু দেখিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়। এসব নিবন্ধনের সঙ্গে বাস্তব কোনো শিশুর অস্তিত্বের মিল পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ডেপুটি জেনারেল (যুগ্মসচিব) মো. লুৎফুর রহমানের স্বাক্ষরে গত ৯ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিঠির অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) সচিব, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সাতটি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্যই এসব ভুয়া নিবন্ধন করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে আবুল বাছেরকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।

গত ২৭ আগস্ট তিনি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য লিখিতভাবে দেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অতিরিক্ত চাপের কারণে ৭৪টি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করেছিলেন। তবে তিনি দাবি করেন, এসব নিবন্ধন সঠিক ছিল না এবং সেগুলো বাতিল করার জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন।

তার লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন শিশুদের জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত দেখিয়ে বিডিআরআইএসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছিল।

ঘটনাটি গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে আবুল বাছেরের নিবন্ধন সহকারীর ক্ষমতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে নিবন্ধন সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষিত বিডিআরআইএসের তথ্যের শুদ্ধতা নষ্ট করা হয়েছে। এ কারণে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১১ অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আবুল বাছের আগে চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিবন্ধন সহকারী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি টুমচর ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত।

চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শুভ্রজিত রায় বলেন, “বাছের চররমনী মোহন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। এখন তিনি টুমচর ইউনিয়নে কর্মরত আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি।”

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, অভিযোগের বিষয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে বাছেরের লিখিত জবাব দেওয়ার কথা ছিল। তিনি জবাব দিয়েছেন কি না, তা উপজেলা প্রশাসনের কাছে এখনো নিশ্চিত নয়।

তিনি বলেন, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে তাদের কাছে এখনো কোনো চিঠি আসেনি। চিঠি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থায় কীভাবে অস্তিত্বহীন ব্যক্তির তথ্য প্রবেশ করানো হলো এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য এমন অনিয়মের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় তথ্যভান্ডারে ভুয়া তথ্য সংযোজন শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; ভবিষ্যতে নাগরিকের পরিচয়, সরকারি সেবা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আবুল বাছেরের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন সামনে এগোবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে