×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব পেলেন বিতর্কিত সেই প্রকৌশলী!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১১:১০:২৩
২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব পেলেন বিতর্কিত সেই প্রকৌশলী!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভবন নির্মাণে অনিয়মের তদন্তে শাস্তি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয়েছিল তার। একই সঙ্গে চার বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে নিয়মিত দেরিতে উপস্থিত হওয়া, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগেও তাকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তদবির এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএনপির স্থানীয় নেতারাও দলীয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে চিঠি দিয়েছিলেন। এতসব অভিযোগ ও অতীতের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পেরিয়ে এবার সেই প্রকৌশলীই পেয়েছেন খুলনা ওয়াসার প্রায় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব। আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল। তিনি বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠে আসে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি নির্মাণের পর সেখানে হাঁটাচলার সময় কম্পন অনুভূত হওয়ায় ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত ওই কমিটি ভবনের ছাদের কয়েকটি স্থানে পরীক্ষা চালায়। তদন্তে নকশা অনুযায়ী ছাদের কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কিছু জায়গায় তা মাত্র ৩ ইঞ্চি এবং কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে ভবনের স্থায়িত্ব ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়, ছাদ ঢালাইয়ের সময় আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে ফেরার পর তার অনুপস্থিতির সময়ে সম্পন্ন হওয়া নির্মাণকাজের মেজারমেন্ট বুক বা এমবি যথাযথভাবে যাচাই না করেই তাতে স্বাক্ষর করা হয় এবং ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সাতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয় এবং চার বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়।

তবে পরবর্তী সময়ে তার চাকরিজীবনে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিরুদ্ধে নেওয়া আগের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করা হয় বলে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। ২০২৫ সালে তাকে উপ-প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর খুলনা ওয়াসায় উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ডিএমডি পদে প্রেষণে পাঠানো হয় তাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তাকে অন্য একটি সংস্থায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা ছিল ব্যতিক্রমী। তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং অ্যাবের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও এ সময় আলোচনায় আসে। তবে জুয়েল তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, অতীতে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও পদোন্নতির মাধ্যমে তার প্রতি ন্যায্য মূল্যায়ন করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগটি আরও জোরালো হয় ২০২৫ সালের জুনে খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দেওয়া একটি চিঠিকে ঘিরে। ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে হস্তক্ষেপ, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার জন্য তদবির করছেন। কুয়েটসহ বিভিন্ন সরকারি প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগও ওই চিঠিতে তোলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন কর্মকাণ্ডের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে দাবি করে তার সংগঠনের পদ বাতিলের সুপারিশও করা হয়। তবে এসব অভিযোগও জুয়েল প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে আগের শাস্তি প্রত্যাহার এবং পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তার দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও কাজের মূল্যায়ন হিসেবে।

শুধু রাজনৈতিক প্রভাব নয়, কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে সূত্রগুলো দাবি করেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের প্রতিদিনই তিনি নির্ধারিত সময়ের পরে অফিসে উপস্থিত হন। এর মধ্যে ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করার অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিসে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ তাকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। খুলনা ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পরও তিনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং ডিএমডির হাজিরা খাতা ও ফিঙ্গারপ্রিন্টে উপস্থিতি দেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হওয়ার বিষয়টি। খুলনা ওয়াসার এই বড় প্রকল্পের রুটিন দায়িত্বে আগে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে একাধিকবার পরিবর্তন ঘটে। প্রথমে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে। এর মধ্যেই আরিফুল ইসলাম জুয়েল প্রকল্পটির দায়িত্ব পাওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে সূত্রগুলো দাবি করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের অভিযোগ ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব তার হাতে আসে। তবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, এটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিষয় এবং এ বিষয়ে তার বলার কিছু নেই।

এখন প্রশ্ন উঠছে, অতীতে যে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং যার কর্মদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, তাকে কীভাবে এত বড় অঙ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো। বিশেষ করে খুলনা ওয়াসা দীর্ঘদিন ধরে পানি সরবরাহ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, বিলসংক্রান্ত ভোগান্তি এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে সমালোচনার মুখে রয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তা নির্বাচন করা উচিত।

তবে পুরো বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার সবগুলোই এখন পর্যন্ত আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত—এমন তথ্য নেই। অতীতের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর তার পদোন্নতি হয়েছে এবং তিনি নিজেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হিসেবে দাবি করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, আগের শাস্তি বাতিলের প্রক্রিয়া এবং ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ—এই তিনটি বিষয়ই স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের মান এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নজরদারি প্রয়োজন।

কারণ এই প্রকল্পের সঙ্গে শুধু বিপুল সরকারি অর্থ নয়, খুলনা নগরীর লাখো মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহের বিষয়টি জড়িত। প্রকল্প পরিচালককে ঘিরে বিতর্ক যতই থাকুক, শেষ পর্যন্ত জনগণ দেখতে চাইবে প্রকল্পটি কতটা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, নির্ধারিত অর্থের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে কি না এবং প্রতিশ্রুত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা উন্নত হচ্ছে। অতীতের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি; আর যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার জন্যও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি খুলনা ওয়াসার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে