×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদির মরিয়া চেষ্টা, সরাসরি হামলায় ট্রাম্পের ‘না’

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১০:২৭:১৯
সৌদির মরিয়া চেষ্টা, সরাসরি হামলায় ট্রাম্পের ‘না’

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান তৎপরতায় নতুন করে উদ্বেগে পড়েছে সৌদি আরব। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের মধ্যে অন্তত দুবার ফোনালাপ হয়েছে। আলোচনায় হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপ এবং লোহিতসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে হুথিদের ওপর সরাসরি মার্কিন হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্প এখনো সম্মতি দেননি। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতিটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হলো এই অঞ্চল। বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ বা সেখানে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের জন্য লোহিতসাগরপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়; এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের লোহিতসাগর উপকূলে হুথিদের তৎপরতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বাব আল-মান্দেবের কাছে কৌশলগত অবস্থানগুলোতে তাদের অগ্রসর হওয়ার খবরের পাশাপাশি সৌদি জাহাজ চলাচল নিয়েও হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজগুলোকে লোহিতসাগরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। এমন অবস্থান কার্যকর হলে সৌদি আরবের জন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোও ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রুট পরিবর্তন বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে।

তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হলেও হুথিদের ওপর সরাসরি মার্কিন হামলায় সম্মতি দেওয়া হয়নি। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং লোহিতসাগরের নৌ-চলাচলের ওপর হুমকি আরও গুরুতর হলে তাদের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে সামনের দিনগুলোতে হুথিদের সামরিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা—দুটিই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সৌদি আরব সফরও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার সফরকে সৌদি ও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত থাকলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে রিয়াদের কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর আগে সৌদি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছিলেন যে তারা নিজেরাই হুথিদের মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এমনটা তারা চান না। কিন্তু লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে ঝুঁকি বাড়ায় এখন ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অতিরিক্ত সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো সৌদি আরবের অর্থনীতি ও জ্বালানি রপ্তানির নিরাপত্তা। সৌদি তেল সরবরাহের একটি অংশ বিভিন্ন সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হলে বিকল্প রুটের ওপর চাপ বাড়ে। ফলে বাব আল-মান্দেব ও লোহিতসাগরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু সৌদি আরব নয়, বিশ্ববাজারেও তেল পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময় বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এখন আর কেবল সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যকার সীমিত সামরিক সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। ইরান-সমর্থিত হুথিদের অবস্থান, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং লোহিতসাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথ—সবকিছু মিলিয়ে এটি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী সামরিক সহযোগিতা পায় এবং হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে, তাহলে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা এড়িয়ে শুধু গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকলে রিয়াদকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—হুথিদের অগ্রগতি কতটা বাড়ে এবং লোহিতসাগরের আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলে তাদের হুমকি কতটা বাস্তব রূপ নেয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আর যদি কূটনৈতিক ও সামরিক চাপের মাধ্যমে হুথিদের অগ্রগতি ঠেকানো যায়, তাহলে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, লোহিতসাগরের নিরাপত্তা এখন সৌদি আরবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যু।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে